ভ্রমণ ভিসায় বিদেশে নিয়ে নির্যাতন ও অর্থ আদায় করেন তারা

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৮:৪৯ পিএম | আপডেট: ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১১:১৯ এএম


ভ্রমণ ভিসায় বিদেশে নিয়ে নির্যাতন ও অর্থ আদায় করেন তারা

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ান (র‌্যাব) এক অভিযানে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম ও রাজধানীর গুলশান এলাকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যে অবৈধভাবে মানবপাচার চক্রের অন্যতম হোতাসহ চার জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এ সময় বিপুল পরিমাণ পাসপোর্ট জব্দ করে সংস্থাটি।

তাদের গ্রেপ্তারের পর র‌্যাব বলছে, বিদেশগামী যাত্রীদের প্রথমে ভ্রমণ ভিসা দেয় এই চক্রটি, পরে ওয়ার্ক পারমিট ভিসা দেওয়া হবে বলে জানায়। সেটি না দিয়ে যাত্রীদের বলে ভিসা এখন বন্ধ। এরপর ভ্রমণ ভিসায় বিদেশে পৌঁছানোর পর দালালরা ভিকটিমদের অজ্ঞাত স্থানে বন্দি করে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে অর্থ আদায় করেন।

সোমবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ সব তথ্য জানান র‌্যাব-৩ অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ।

এর আগে ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে র‌্যাব-৩ এর একটি আভিযানিক দল সোমবার ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম ও রাজধানীর গুলশান এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে অবৈধভাবে মানবপাচার চক্রের এ সব সদস্যদের গ্রেপ্তার করে।

গ্রেপ্তার আসামিরা হলেন- তোফায়েল আহমেদ (২৮), মো. আক্তার হোসেন (৩৮), মো. আনিছুর রহমান (৩৬), মো. রাসেল (৩০)।

গ্রেপ্তারের সময় আসামিদের কাছ থেকে ১৬টি পাসপোর্ট, ৩টি চেক বই, ৪টি স্ট্যাম্প, ৫টি মোবাইল ফোন, ৪টি বিএমইটি কার্ড, ৪টি রেজিস্ট্রার উদ্ধার করা হয়।

র‌্যাব-৩ অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন বলেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তারা সংঘবদ্ধ মানবপাচার চক্রের সদস্য। এই চক্রের মূল হোতা দুবাই প্রবাসী তোফায়েল আহমেদ ও বাংলাদেশে ওই চক্রের অন্যতম হোতা মো. আনিছুর রহমান ও মো. আক্তার হোসেন। এ ছাড়াও আসামি মো. রাসেল হচ্ছেন তাদের অন্যতম সহযোগী।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, তারা বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দালালের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উচ্চ বেতনে বিভিন্ন কোম্পানিতে চাকরি দেওয়ার নাম করে ভিকটিম এবং তাদের অভিভাবকদের প্রলুব্ধ করেন। মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর খরচ বাবদ প্রাথমিকভাবে তারা ৪ হতে ৫ লাখ টাকা নিয়ে থাকেন। এ ছাড়াও ইউরোপ ও এশিয়ার অন্যান্য দেশে পাঠানোর জন্য তারা ৬ থেকে ৮ লাখ টাকা নিয়ে থাকেন।

তিনি বলেন, তাদের প্রলোভনে পড়ে ভিকটিম এবং তাদের অভিভাবকরা রাজি হলে প্রথমে তারা পাসপোর্ট এবং প্রাথমিক খরচ বাবদ ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা নিয়ে থাকেন। তারপর ভিকটিম এবং অভিভাবকদের বিদেশ থেকে তাদের বিভিন্ন দালালের মাধ্যমে ফোন দিয়ে তাদের আশ্বস্ত করে যে, আসামিদের মাধ্যমে বিদেশ গিয়ে তারা খুব ভাল আছে এবং অনেক অর্থ উপার্জন করে তারা তাদের ভাগ্য বদল করতে সক্ষম হয়েছে।

তিনি বলেন, বিদেশ থেকে ফোন পাওয়ার পর ভিকটিম এবং অভিভাবকরা আরও অধিক আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এ সব সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পরিবহন খরচ, ভিসা খরচ, মেডিকেল খরচ, বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স ইত্যাদি খরচের কথা বলে আসামিরা ধাপে ধাপে ভিকটিমদের থেকে টাকা আত্মসাৎ করতে থাকেন। অভিভাবকরা স্বপ্নে বিভোর থাকেন। ফলে এই সময়ে ভিকটিম আসামিদের প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেন না।

অন্যদিকে আসামিরা ফ্লাইটের পূর্বে ভিকটিমের পাসপোর্ট, ভিসা কিংবা টিকেট কোনো কিছুই হস্তান্তর করে না। আসামিদের চাহিদা মাফিক ভিকটিম এবং অভিভাবকদের থেকে অর্থ আদায় শেষ হলে আসামিরা একটি নির্দিষ্ট তারিখে কাপড় ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে বিমান বন্দরে হাজির হতে বলেন। বিদেশে ফ্লাইটের দিন বিমান বন্দরে প্রবেশ গেটে ভিকটিমদের তাদের পাসপোর্ট, ভিসা এবং টিকেট হস্তান্তর করা হয়। বিমান বন্দরে ইমিগ্রেশনে যাওয়ার পর ভিকটিম বুঝতে পারেন তাকে ভ্রমণ ভিসায় বিদেশ পাঠানো হচ্ছে। তখন আসামিদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা ছাড়া ভিকটিমের কিছুই করার থাকে না। আসামিরা তখন আশ্বস্ত করে বিদেশ যাওয়ার পর তাদের ওয়ার্কিং ভিসা করে দেওয়া হবে।

র‌্যাব জানায়, বিদেশে পৌঁছার পর দুবাই প্রবাসী জাহিদ ভিকটিমদের স্বাগত জানিয়ে একটি অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। তারপর ভিকটিমের কাছ থেকে পাসপোর্ট ও নগদ অর্থ ছিনিয়ে নেওয়া হয়। তারপর তাদের একটি সাজানো কোম্পানিতে চাকরি দেওয়া হয়। চার পাঁচ দিন পর ওই কোম্পানি থেকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, কোম্পানি আইনি জটিলতার কারণে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। তারপর জাহিদ ভিকটিমদের অজ্ঞাত স্থানে বন্দি করে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে অর্থ আদায় করেন।

র‌্যাব-৩ অধিনায়ক বলেন, আসামিদের ট্রাভেল এজেন্সি বা রিক্রুটিং এজেন্সি পরিচালনার কোনো লাইসেন্স নেই। তারা শুধুমাত্র সিটি করপোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে সিটি এক্সপ্রেস ট্রাভেল এজেন্সি নামে মানবপাচার ব্যবসা করে আসছে। স্বল্প সময়ে, বিনাশ্রমে অধিক লাভ বা অর্থ উপার্জনই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। ভিকটিমরা বিদেশ গিয়ে কোনো কাজ না পেয়ে সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার এবং আর্থিকভাবে সর্বশান্ত হলেও তাদের কোনো অনুশোচনা নেই। অবশেষে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা হয়।

তিনি বলেন, এই ধরনের অপরাধ থেকে দূরে থাকতে হলে সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং প্রয়োজনে প্রশাসনের সহযোগিতা নিতে হবে।

গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানান র‌্যাবের এই কর্মকর্তা।

কেএম/আরএ/


বিভাগ : অপরাধ