ভারত বিরোধী স্টেটাস, শিবির সন্দেহে আবরারকে পিটিয়ে হত্যা

০৭ অক্টোবর ২০১৯, ০৪:৫১ পিএম | আপডেট: ১১ আগস্ট ২০২০, ০৭:২৪ পিএম


ভারত বিরোধী স্টেটাস, শিবির সন্দেহে আবরারকে পিটিয়ে হত্যা
ছবি সংগৃহীত

মৃত্যুর ৮ ঘণ্টা আগে ভারতকে সমুদ্র বন্দর, পানি ও গ্যাস দেয়ার চুক্তির বিরোধিতা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ। শনিবার বিকাল সাড়ে ৫ টায় ওই স্ট্যাটাসের পর রোববার মধ্যরাতে ফাহাদের মৃত্যুর খবর পায় তার পরিবার।

স্ট্যাটাসে ফাহাদ লেখেন, ‘৪৭-এ দেশভাগের পর দেশের পশ্চিমাংশে কোনো সমুদ্রবন্দর ছিল না। তৎকালীন সরকার ছয় মাসের জন্য কলকাতা বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করল। কিন্তু দাদারা নিজেদের রাস্তা নিজেদের মাপার পরামর্শ দিছিল। বাধ্য হয়ে দুর্ভিক্ষ দমনে উদ্বোধনের আগেই মংলা বন্দর খুলে দেয়া হয়েছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস আজ ইন্ডিয়াকে সে মংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য হাত পাততে হচ্ছে।

তিনি আরও লেখেন, কাবেরি নদীর পানি ছাড়াছাড়ি নিয়ে কানাড়ি আর তামিলদের কামড়াকামড়ি কয়েকবছর আগে শিরোনাম হয়েছিল। যে দেশের এক রাজ্যই অন্যকে পানি দিতে চায় না সেখানে আমরা বিনিময় ছাড়া দিনে দেড়লাখ কিউসেক মিটার পানি দেব।’

ভারতকে গ্যাস দেয়ার সমালোচনা করে বুয়েটের এই শিক্ষার্থী লেখেন, ‘কয়েকবছর আগে নিজেদের সম্পদ রক্ষার দোহাই দিয়ে উত্তর ভারত কয়লা-পাথর রফতানি বন্ধ করেছে অথচ আমরা তাদের গ্যাস দেব। যেখানে গ্যাসের অভাবে নিজেদের কারখানা বন্ধ করা লাগে সেখানে নিজের সম্পদ দিয়ে বন্ধুর বাতি জ্বালাব।’

স্ট্যাটাসের শেষ তিনি কবি কামিনী রায়ের একটি কবিতা জুড়ে দিয়ে বলেন, হয়তো এ সুখের খোঁজেই কবি লিখেছেন-

‘পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি

এ জীবন মন সকলি দাও,

তার মত সুখ কোথাও কি আছে

আপনার কথা ভুলিয়া যাও।’

এদিকে শিবির সন্দেহে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শেরে বাংলা হলের এক শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে মেরে ফেলার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। হলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শিবির সন্দেহে আবরারকে রবিবার রাত আটটার দিকে হলের ২০১১ নম্বর কক্ষ থেকে ডেকে নিয়ে যায় বুয়েট ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। পরে রাত আড়াইটার দিকে হলের সিঁড়ির পাশে আবরারের দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে ডাক্তারকে খবর দিলে তিনি এসে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

মারধরের সময় ওই কক্ষে উপস্থিত ছিলেন বুয়েট ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক আশিকুল ইসলাম বিটু। তিনি বলেন, আবরারকে শিবির সন্দেহে রাত আটটার দিকে হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে আনা হয়। সেখানে আমরা তার মোবাইলে ফেসবুক ও মেসেঞ্জার চেক করি। ফেসবুকে বিতর্কিত কিছু পেইজে তার লাইক দেয়ার প্রমাণ পাই। সে কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগও করেছে। শিবির সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাই। এক পর্যায়ে আমি রুম থেকে বের হয়ে আসি। এরপর হয়তো তাকে মারধর করে থাকতে পারে। পরে রাত তিনটার দিকে শুনি আবরার মারা গেছে।

নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে ফাহাদের একজন রুমমেট ঘটনার বিষয়ে বলেন, টিউশনি শেষে রুমে রাত নয়টার দিকে আসি। তখন আবরার রুমে ছিলো না। অন্য রুমমেটদের কাছ থেকে জানতে পারি তাকে ছাত্রলীগের ভাইয়েরা ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নিয়ে গেছে। পরে রাত আড়াইটার দিকে হলের একজন এসে আবরার আমাদের রুমমেট কিনা জানতে চান। আমি হ্যাঁ বললে সিঁড়ি রুমের দিকে যাওয়ার জন্য বলেন। পরে সিড়ি রুমের দিকে গিয়ে একটা তোশকের ওপরে আবরার পড়ে আছে। পরে ডাক্তার এসে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

শেরে বাংলা হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক জাফর ইকবাল খান বলেন, ডাক্তারের ফোন পেয়ে হলে আসি। এসে ছেলেটির লাশ পড়ে আছে। ডাক্তার জানান ছেলেটি আর নেই। পরে তাকে পুলিশের সহায়তায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাইনি। পুলিশ ঘটনাটি খতিয়ে দেখছে। হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদেরকে সব ধরনের সহায়তা করা হবে।

ডাক্তার মাসুক এলাহী জানান, রাত তিনটার দিকে হলের শিক্ষার্থীরা আমাকে ফোন দেয়। আমি হলে গিয়ে সিঁড়ির পাশে ছেলেটিকে পড়ে শোয়ানো অবস্থায় দেখতে পাই। ততক্ষণে ছেলেটি মারা গেছে। তার সারা শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন দেখতে পাই।

ঘটনার বিষয়ে লালবাগ জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার কামাল হোসাইন কালের কণ্ঠকে জানান, হল প্রশাসনের কাছ থেকে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসি। এসে ছেলেটির লাশ দেখতে পাই। পরে তা উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


বিভাগ : জাতীয়