সুপারহিরোদের হার মানানো একজন সারাহ ইসলাম

২১ জানুয়ারি ২০২৩, ০১:৪০ এএম | আপডেট: ২৯ জানুয়ারি ২০২৩, ০১:০১ এএম


সুপারহিরোদের হার মানানো একজন সারাহ ইসলাম

তেমন কোনো পরিচিত মুখ নন। বিখ্যাত কোনো তারকাও নন। এমনকি নেট দুনিয়ায়ও ছিলনা তার নামে কোনো চর্চা। সারাজীবন ছিলেন পর্দার অন্তরালে। কিন্তু পর্দার আড়ালে থাকা এই মানুষটিই হয়ে উঠলেন মহামানবী। হয়ে উঠলেন বাস্তবের সুপারহিরো। পর্দায় যে সুপার হিরোদের আমরা দেখি বাস্তবে তাদের দেখা না মিললেও মাত্র ২০ বছরের জীবনে সারা যা করে গেছেন তা পর্দার সুপারহিরোদের সুপার পাওয়ারকেও হার মানায়। আজ দেশের প্রতিটি গণমাধ্যমের শিরোনাম তিনি। সব শ্রেণি পেশার মানুষদের প্রধান আলোচনার বিষয়বস্তু একটি নাম, সারাহ ইসলাম।

সারাহ'র নাম উঠে আসে গণমাধ্যমে একটি সংবাদ প্রকাশের পর। গেল ১৯ জানুয়ারি একজন ব্রেন ডেথ রোগীর দুটি কিডনি সফলভাবে দুজনের শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) প্রক্টর এবং ইউরোলোজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. হাবিবুর রহমান দুলালের নেতৃত্বে এই অপারেশনের পর জানা যায় সেই ব্রেন ডেথ রোগীর নাম সারাহ ইসলাম। যিনি ক্ষণজন্মা জীবন নিয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন ঠিকই কিন্তু যেতে যেতে দুজন মানুষের জীবন প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়ে গেলেন। শুধু তাই নয় মৃত্যুর আগে পুরো দেহটাই দান করে গেছেন তিনি।

মৃত্যুর পর যতটা উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়েছেন সারাহ ইসলাম, বেঁচে থাকতে এর চেয়েও বেশি লড়াই করতে হয়েছে তাকে। জন্মের মাত্র ১০ মাসের মাথায় দুরারোগ্য টিউবেরাস স্কোলোরোসিস রোগে আক্রান্ত হন সারা। এ রোগের সঙ্গে তিনি লড়াই করেছেন দীর্ঘ ১৯টি বছর। তবে এই লড়াইয়ের মাঝেও কোনো কিছুই থেমে থাকেনি। অগ্রণী গার্লস স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও হলিক্রস কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক দুটিতেই ভালো রেজাল্ট করেন সারাহ। স্বপ্ন ছিল কার্টুনিস্ট হবেন, সে স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে ভর্তি হন ইউনিভার্সিটি অফ ডেভলভমেন্ট অলটারনেটিভ (ইউডা) এর ফাইন আর্টস বিভাগে। প্রথম বর্ষেই শিক্ষকদের প্রিয় ছাত্রী হয়ে উঠেছিলেন।

মৃত্যুর চারদিন আগে ব্রেন অপারেশনের জন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয় সারাহকে। সেখানে অবস্থা খারাপ হলে নিয়ে যাওয়া হয় বিএসএমএমইউ তে। কিন্তু যখন সারাহ বুঝতে পারেন তার অবস্থা ভালো না, হাতে আর খুব বেশি সময় নেই, সেই মুহূর্তে মাকে বলে যান মৃত্যুর পর যেন তার অঙ্গ দান করা হয়।

এ বিষয়ে বিএসএমএমইউ'র প্রক্টর অধ্যাপক হাবিবুর রহমান দুলাল বলেন, মৃত্যুর পর তার মা আমাদের বিষয়টি জানান। তার সম্মতিতেই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়। সারাহ তার পুরো অঙ্গটাই দান করে গেছেন। আমাদের দেশে হার্ট ও লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট এখনও সেভাবে শুরু হয়নি বলে এ দুটি অঙ্গ নেওয়া হয়নি। সেগুলোর ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন। সারাহকে বীরের মর্যাদা দেওয়া উচিত। মরণোত্তর কিডনি দানে উদ্বুদ্ধ করতে সারাহ'র এই দান মানুষের কাছে উদাহরণ হয়ে থাকবে।

বিএসএমএমইউ উপাচার্য মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘প্রথম অঙ্গদাতা সারাহ ইসলামের নাম চিকিৎসাক্ষেত্রে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তার এ ত্যাগের মাধ্যমে মানুষের মাঝে সচেতনতা তৈরি হবে। অনেক মানুষ নতুন জীবন পাবে। ইতোপূর্বে আমরা এ ধরনের একাধিক রোগীর ক্ষেত্রে সফল হতে গিয়েও অঙ্গদানে রাজী করাতে পারিনি। কিন্তু প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছি। তারই ধারাবাহিকতায় আজ সফল হয়েছি। বাংলাদেশের চিকিৎসা শাস্ত্রের জগতে ইতিহাস সৃষ্টি করতে পেরেছি।

জানা গেছে, সারাহ ইসলামের দুটি কিডনির একটি মিরপুরের বাসিন্দা ৩৪ বছর বয়সী শামীমা আক্তারের শরীরে এবং আরেকটি কিডনি ফাউন্ডেশনে অন্য আরেকজনের শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। এ ছাড়া সারাহ'র দুটি কর্নিয়া দুজনের চোখে লাগানো হয়। একজনের অস্ত্রোপচার হয় বিএসএমএমইউতে, অন্যজনের সন্ধানী চক্ষু হাসপাতালে।

পেশায় শিক্ষক মা শবনম সুলতানা ও বাবা শহীদুল ইসলাম দম্পতির বড় সন্তান সারাহ। পুরো নাম সারাহ ইসলাম ঐশ্বর্য। সারাহ'র দেহদান সম্পর্কে তার মা বলেন, ‘সারাহ সত্যি সত্যি স্বর্গীয় সন্তান ছিল। যেখানে যেত, ব্যবহার দিয়ে সবাইকে মোহিত করে রাখত। ও বলেছিল, ‘আমার সবকিছু গবেষণার জন্য দিয়ে দিতে পারো মা। সারাহ'র ইচ্ছা ছিল, ওর ব্রেন নিয়ে গবেষণা হোক।’

১৯ জানুয়ারি সকাল ৮টায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিএসএমএমইউ উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষক, চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অংশ নেন। এরপর তার মরদেহ আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।

সদ্য কৈশর পেরুনো একজন নারী অথচ কি দারুণ তার মহানুভবতা। দুখু মিঞা বলেছিলেন 'এমন জীবন তুমি করিও গঠন, মরিয়া হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন'। পংক্তিদ্বয় হয়তো সারাহকে উদ্দেশ্য করেই লিখেছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। যা আজ সত্য হল।

বিদায় সারাহ ইসলাম। আপনি বেঁচে থাকবেন বাংলাদেশের কোটি প্রাণের ভালোবাসায়। স্মরণীয় হয়ে থাকবেন নিজের মহানুভবতায়। প্রজন্মের কাছে হয়ে থাকবেন অনুসরনীয়।

[লেখক: সাংবাদিক]

/এএস


বিভাগ : মতামত