সম্ভাবনাময় মধু শিল্প, বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের হাতছানি

২২ জানুয়ারি ২০২৩, ০৭:১২ পিএম | আপডেট: ২৮ জানুয়ারি ২০২৩, ০৮:৪৭ পিএম


সম্ভাবনাময় মধু শিল্প, বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের হাতছানি

অপার সম্ভাবনার এক শিল্পের নাম ‘মধু’। কিন্তু সম্ভাবনাময় এই খাতটি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। তবে আশার কথা হচ্ছে দেরিতে হলেও মধু নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)।

গত কয়েক বছরে দেশে সরিষা মধুর চাহিদা বাড়লেও এতদিন সরকারিভাবে মধু চাষীদের খুব একটা সুবিধা দেওয়া হয়নি। তবে চলতি ২০২২-২০২৩ রবি মৌসুমে মধু চাষের উপর আলাদা গুরুত্ব দিয়েছে সরকারের কৃষি বিভাগ। যার ফলে চলতি মৌসুমে প্রথমবারের মতো দেশে মধু চাষে রীতিমতো বিপ্লব ঘটতে যাচ্ছে।

বিগত সময়ে দেশে সরিষা থেকে যে পরিমাণ মধু চাষ হতো তার কয়েকগুণ বেশি মধু চাষ হবে চলতি মৌসুমে, এমনটা আশা করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

অপরদিকে মধু চাষিরা বলছেন, সরিষা থেকে উৎপাদিত মধু খুবই উন্নতমানের। কিন্তু নানান প্রতিকূলতার কারণে চাষীরা যথাযথভাবে মধু চাষ করতে পারছেন না। এতদিন সরকারের কৃষি বিভাগ সরিষা থেকে মধু চাষের বিষয়টিতে খুব একটা গুরুত্ত্ব না দিলেও চলতি মৌসুমে এসে তারা নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। কিন্তু সংকট এখনো থেকে গেছে। এটি একটি বড় ও সম্ভাবনাময় শিল্প হতে পারে দাবি করেন মধু চাষিরা।

তারা বলেন, মধু উৎপাদন থেকে শুরু করে বয়ামজাত করা এবং বাজারজাত পর্যন্ত সরকারের টেকনিক্যাল এবং আর্থিক সহযোগিতা পেলে মধু রপ্তানি করে মোটা অঙ্কের বৈদিশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। শুধু দরকার সরকারের যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা। একইসঙ্গে মধু চাষিরা বলছেন, মধু চাষকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা করে সব ধরনের সহযোগিতা দিলে বেকারত্বও দূর হবে।

কৃষি বিভাগ সূত্রে এবং মধু চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকরা নিজ উদ্যোগে সরিষা ক্ষেতে স্থানীয় পদ্ধতিতে মৌ চাষ করেছেন। মধু চাষে কৃষি বিভাগের কোনো লক্ষ্যমাত্রাও ছিল না। আবার মধু চাষ করলেও চাষিরা যথাযথ নিয়মে মধু প্রক্রিয়াজাত করে সংরক্ষণ ও বাজারজাত করতে পারেননি। এখনো পারছেন না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মধু চাষিরা আহরিত মধু খোলা বিক্রি করছেন। তাতে চাষিরা আর্থিকভাবে খুব একটা লাভ হচ্ছেন না। কিন্তু মধু চাষিরা তাতে হাল ছাড়েননি। তারা প্রতি বছর সরিষা থেকে মধু চাষ করে আসছেন। নিজ উদ্যোগে চাষিদের এই মধু চাষ থেকে প্রতিবছরই তিন-চার লাখ কেজি মধু আহরণ হতো। চলতি বছরও চাষিরা একইভাবে মধু চাষের উদ্যোগ নেন। তবে তাদের এই উদ্যোগের সঙ্গে এবারই প্রথম সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ মধু চাষে মনোযোগ দিয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি ২০২২-২০২৩ রবি মৌসুমে তিন লাখ ২৩৬ হেক্টর জমিকে মধু চাষের আওতায় এনেছে। ডিএইর তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ৮ লাখ ১২৩ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ করেছে। এ ছাড়া, শূন্য দশমিক শূন্য ৭৬ লাখ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী, শূন্য দশমিক ১০৬ লাখ শতাংশে কালোজিরা, এক লাখ ৮৬৬ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ, শূন্য দশমিক ৪০৩ লাখ হেক্টর জমিতে ধনিয়া, এক লাখ ২৯৪ হেক্টর জমিতে আম এবং শূন্য দশমিক ১২৫ লাখ হেক্টর জমিতে লিচু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। মোট ১১ লাখ ৯৯৪ হেক্টর জমিতে এসব ফসল চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব ফসলী জমির মধ্যে তিন লাখ ২৩৬ হেক্টর জমি মৌ চাষের আওতায় আনা হয়েছে।

এবার প্রথমবারের মতো মৌ চাষের জন্য কৃষি বিভগ থেকে সারা দেশে মৌ চাষিদেরকে এক লাখ ৭১ হাজার ৪৩৩টি বাক্স স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শুধু সরিষা ক্ষেতে বাক্স স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় এক লাখ ৪৬ হাজার ৮৪০টি। ইতিমধ্যে এক লাখ এক হাজার ৪৬২টি বাক্সে মৌ চাষের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে। যার মধ্যে শুধু সরিষা থেকে অর্জত মৌ বাক্সের সংখ্যা হচ্ছে এক লাখ এক হাজার ৩৭টি।

প্রতি বছর চাষিরা নিজ উদ্যোগে মৌ চাষ করে তিন থেকে চার লাখ কেজি মধু আহরণ করলেও চলতি রবি মৌসুমে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছে আট লাখ ৩৬ হাজার ৪৬ কেজি। ডিএইর তথ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যে আট লাখ ৪৮ হাজার ৩১০ কেজি মধু আহরণ বা সংগ্রহ হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। এখনো মধু সংগ্রহের কার্যক্রম চলছে। ধারণা করা হচ্ছে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আরও অনেক বেশি মধু সংগ্রহ হবে। যা অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে।

ডিএইর মহাপরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাস ঢাকাপ্রকাশ-কে বলেন, বর্তমানে সারা দেশে মধু চাষের ব্যাপ্তি বেড়েছে। এখন আমরা মধু চাষের উপর গুরুত্ত্ব দিচ্ছি। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে মৌ চাষিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। মৌ চাষের জন্য চাষিদেরকে উন্নতমানের বাক্স সরবরাহ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা মধু চাষে বেসরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগকে উৎসাহ দিচ্ছি।’

ডিএই মহাপরিচালক বলেন, মধু খুবই সম্ভাবনাময় একটি খাত। এই খাত থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। আমরা যদি যথাযথ নিয়মে মধু সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ করতে পারি তাহলে অনেক সম্ভাবনা আছে এই খাতে।

তিনি জানান, মধু বোতলজাত বা বয়ামজাত তথা প্যাকেজিং করতে শিল্প মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে। ডিএই মহাপরিচালক মনে করেন, ভারতের ডাবর মধুর চেয়ে আমাদের মধু অনেক ভালো মানের। ডাবর মধু যদি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিক্রি হতে পারে, তাহলে আমাদের মধু নয় কেন?

মধু চাষিরা বলছেন সম্ভাবনাময় খাত

মধু চাষিরা বলছেন, অপার সম্ভাবনার এই খাতকে প্রণোদনা দিলে মধু চাষিরা যেমন সাহস ও উৎসাহ পাবে তেমনি বহু বেকার তরুণ-যুবকের কর্মসংস্থান হবে। শুধু মধু রপ্তানি করেই শত শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

সাতক্ষীরার মৌ চাষি মোশাররফ হোসেন ঢাকাপ্রকাশ-কে বলেন, ২০০০ সালে প্রথম ব্যক্তিগত উদ্যোগে মধু চাষ শুরু করি। অনেক কষ্ট করে সরিষা ক্ষেতে মৌ চাষের বাক্স বসাই। সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে সব কিছু করি।

তিনি বলেন, আমি যখন মধু চাষ শুরু করি তখন কৃষি বিভাগের কোনো সহযোগিতা ছিল না। আসলে তারা জানতেনই না মধু চাষের বিষয়টি। আমার মতো অনেকেই ব্যক্তি উদ্যোগে মৌ চাষ শুরু করেন। এভাবেই ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যক্তি উদ্যোগে মৌ চাষের প্রসার ঘটে। চাষি থেকে চাষি পর্যায়ে মধু চাষ বিস্তার লাভ করে।

তিনি বলেন, ‘ইদানিং কৃষি বিভাগ মধু চাষে মৌ চাষিদের সহযোগিতা করছে। নানা পরামর্শ দিচ্ছে।’

মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমাদের দেশে মধু একটা অপার সম্ভাবনাময় শিল্প। সাতক্ষীরা বিসিক আমাকে ২০০৮ সালে আশ্বাস দিয়েছিল মধু প্রক্রিয়াজাতকরণে তারা সাতক্ষীরা বিসিক শিল্প নগরীতে প্রযোজনীয় যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি প্ল্যান্ট স্থাপন করবে। কিন্তু সেটা আর হয়ে উঠেনি।’

মোশাররফ বলেন, মৌ চাষ শিল্পকে টেকনিক্যাল ও আর্থিক সহযোগিতা দিলে এটি একটি বৃহৎ শিল্পে রূপান্তরিত হবে। বেকারদের কাজে লাগানো যাবে। কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। ৩০-৫০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করলেই এই শিল্পে লাভবান হওয়া যাবে।’

মোশাররফ আরও জানান, তিনি আগে ব্যক্তিগত উদ্যোগে মৌ চাষ করলেও ২০১৯ সাল থেকে তিনি আর এককভাবে মৌ চাষ করছেন না। এখন তিনি গ্রুপ ভিত্তিক মৌ চাষ করেন। এই মৌসুমে ১০টা ফার্ম মিলে এখন পর্যন্ত ২০ টনের বেশি মধু আহরণ করেছেন।

তিনি আরও জানান, আমাদের দেশি মধুর মান খুবই ভালো। ভালোভাবে রিফাইন করে বয়াম বা বোতলজাত করতে পারলে বৈদেশিক মুদ্র অর্জন করা সম্ভব। তিনি বলেন, সরকারের নীতি নির্ধারকরা যদি বিদেশি মধু আমদানি বন্ধ করে দেশীয় মধু চাষিদের উৎসাহিত করতে পারে।

রাজশাহীর পবা উপজেলার ভাটানবাড়ি গ্রামের মৌ চাষি রেজাউল করিম স্বাধীন ঢাকাপ্রকাশ-কে বলেন, ২০০০ সাল থেকে তিনি মৌ চাষ করে আসছেন। এখন তার মৌ চাষের পরিধি বেড়েছে। তবে সমস্যাও আছে অনেক। বিশেষ করে সরকারি সহযোগিতাটা এখনো তিনি পাননি। যদিও কৃষি বিভাগ মাঝে মধ্যে ডেকে নিয়ে মৌ চাষিদেরকে নানান পরামর্শ দেয়।

তিনি বলেন, চলতি মৌসুমেও তিনি মৌ চাষের জন্য কৃষি বিভাগ থেকে কোনো বাক্স পাননি। তবে নিজ উদ্যোগে ৩৩টা গ্রুপে ৩৩টা বাক্স স্থাপন করে মৌ চাষ করেছেন। এখন পর্যন্ত ৬০০ কেজি মধু আহরণ করেছেন জানিয়ে রেজাউল বলেন, তার সব মধুই বাড়ি থেকে বিক্রি করেন। কোনোরকম প্যাকেটজাত করেন না। প্যাকেজিং করতে গেলে বিএসটিআইয়ের অনুমোদন লাগে। কিন্তু সেটা করতে গেলে অনেক হয়রানি হতে হয়। এ কারণে খোলা মধু বিক্রি করেন।

রেজাউলও মনে করেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে মধু রপ্তানি করে বৈদশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।

যা বললেন কৃষি সচিব

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ওয়াহিদা আক্তার ঢাকাপ্রকাশ-কে বলেন, আমাদের দেশে যে মধু উৎপাদন হয় তার গুণগত মান অনেক ভালো। এটা যদি ঠিকমত চাষিরা বাজারজাত করতে পারতেন তাহলে দেশের বাজারের চাহিদা মেটানো সম্ভব। তাহলে আর মধু আমদানি করতে হবে না।

তিনি বলেন, ‘আমরা মৌ চাষিদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করছি। এখন উৎপাদিত মধু যদি বয়ামজাত করে বিক্রি করা যায় তাহলে কৃষক যেমন লাভবান হবে, তেমনি দেশীয় মধুর বাজারও চাঙ্গা হবে।’

তিনি আরও বলেন, শিল্প মন্ত্রণালয়ের এসএমই নীতিমালায় মধুর কথা বলা আছে। বিসিক এই কাজ করতে পারে। তারা যদি মৌ চাষিদের সহযোগিতা করে তাহলে দেশে উৎপাদিত মধুতেই দেশের চাহিদা মেটানো যেমন সম্ভব, সেইসঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রারও সাশ্রয় হবে।

এনএচইবি/এমএমএ/