সারাবিশ্ব

খাবার কিনতেও ঋণের ওপর নির্ভরশীল আর্জেন্টিনার মানুষ


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:৫৩ পিএম

খাবার কিনতেও ঋণের ওপর নির্ভরশীল আর্জেন্টিনার মানুষ
ছবি: সংগৃহীত

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনা তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত। নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেককে খাবার কিনতেই ব্যক্তিগত সম্পদ বিক্রি করতে হচ্ছে বা ঋণের আশ্রয় নিতে হচ্ছে।

বুয়েনোস আইরেস–এর উপকণ্ঠ ফ্লোরেনসিও ভারেলায় একটি হার্ডওয়্যার দোকানে পূর্ণকালীন বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করেন ৪৩ বছর বয়সী দিয়েগো নাকাসিও। তিনি বলেন, মাসের ১৫ তারিখের মধ্যেই তার ও স্ত্রীর বেতন শেষ হয়ে যায়। এরপর খাবার ও জরুরি খরচ মেটাতে শুরু হয় অতিরিক্ত কাজ খোঁজা, ঘরের জিনিসপত্র বিক্রি করা, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার কিংবা ছোট ঋণ নেওয়ার চেষ্টা।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘২৫ বছর ধরে কঠোর পরিশ্রম করেছি। বাড়ি বানিয়েছি, গাড়ি কিনেছি, সন্তানকে বড় করেছি। অথচ এখন আগের চেয়ে ভালো চাকরি করেও পুরো মাসের খাবার কেনা সম্ভব হচ্ছে না।’

বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, দেশটির প্রায় অর্ধেক মানুষ সঞ্চয় ভাঙছেন, আত্মীয়স্বজন বা ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন কিংবা সম্পদ বিক্রি করছেন দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে। এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৬৩ শতাংশ নাগরিক খরচ কমাতে বিভিন্ন সেবা ও সামাজিক কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, আর্জেন্টিনার দীর্ঘদিনের ঋণ সংকট এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সমাজবিজ্ঞানী ভায়োলেতা কারেরা পেরেইরা বলেন, ‘সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো-মানুষ এখন বাড়ি বা গাড়ির জন্য নয়, খাবার কেনার জন্য ঋণ নিচ্ছে।’

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই কঠোর মিতব্যয়ী অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করেন। সরকারের দাবি, ব্যয় সংকোচন ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে এবং দারিদ্র্য কমেছে।

তবে সমালোচকদের মতে, এই প্রবৃদ্ধি সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। ব্যাংকিং ও কৃষিখাতে কিছুটা উন্নতি হলেও উৎপাদন ও খুচরা বাণিজ্যে মন্দা রয়ে গেছে। খাদ্যপণ্যের চাহিদা কমেছে, আর মুদ্রাস্ফীতি কিছুটা কমলেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বেড়ে সাধারণ মানুষের ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সুপারমার্কেটের প্রায় অর্ধেক কেনাকাটাই হচ্ছে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে-যা রেকর্ড উচ্চতা। একই সঙ্গে ঋণ খেলাপির হারও বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, প্রায় ১১ শতাংশ ব্যক্তিগত ঋণ অনাদায়ী, যা ২০১০ সালের পর সর্বোচ্চ।

৪৯ বছর বয়সী গ্রিসেলদা কুইপিলদর বলেন, ‘পরিবারের কয়েকজন মিলে কাজ করলেও মাসের ১৮ তারিখের পর থেকেই টাকার টান পড়ে। মাসের শুরুতে দেনা শোধ করি, বিল দিই-তারপর আবার ধার নিতে হয়। এটা এক অবিরাম চক্র।’

অর্থনীতিবিদ লুসিয়া কাভালেরো মনে করেন, আর্জেন্টিনায় ঋণ দীর্ঘদিনের সমস্যা হলেও এখন তা সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘ব্যাংকগুলো যেমন সংকটে সহায়তা পায়, তেমনি পরিবারগুলোকেও সহায়তা দিতে হবে। টেকসই সমাধান হলো-মজুরি যেন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, যাতে মানুষ খাবার কিনতে ঋণ নিতে বাধ্য না হয়।’

সূত্র: আল-জাজিরা