সারাবিশ্ব

অর্থনৈতিক সংকটে উত্তাল ইউরোপ, ফ্রান্স-বেলজিয়াম-ইতালি-পর্তুগালে বিক্ষোভ


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৮ এএম

অর্থনৈতিক সংকটে উত্তাল ইউরোপ, ফ্রান্স-বেলজিয়াম-ইতালি-পর্তুগালে বিক্ষোভ
ছবি: সংগৃহীত

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি, আবাসনসংকট ও শিক্ষাব্যবস্থার নানা সমস্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ইউরোপের চার দেশ-ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগাল। স্থানীয় সময় শনিবার দেশগুলোর বিভিন্ন শহরে পৃথক বিক্ষোভ ও সমাবেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। কোথাও বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি স্থানে তা সহিংসতায় রূপ নেয়। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করতে হয়।

অর্থনৈতিক চাপ, ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে জমে ওঠা ক্ষোভ এসব বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বিভিন্ন দেশের সরকারের ওপরও এর ফলে নতুন করে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নাগরিক অসন্তোষের বর্তমান পরিস্থিতি আগামী দিনগুলোতে আরও বিস্তৃত হতে পারে।

ফ্রান্সে ব্যাপক বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও লুটপাট

ফ্রান্সে শনিবার ব্যাপক বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে পাঁচ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর এই বিক্ষোভ আরও বিস্তৃত হয়। একপর্যায়ে বিভিন্ন শহরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং বিক্ষোভের আড়ালে একদল সহিংসতাকারী সরকারি ভবন, বিলাসবহুল বিপণিবিতান ও সুপারশপে হামলা চালায়। পুলিশের গাড়ি ও সদস্যদের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটে।

ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু জানিয়েছেন, বিক্ষোভের ঘটনায় এক হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ১৫০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। প্যারিসের কেন্দ্রীয় এলাকায় দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের দেখতে গিয়ে তিনি বলেন, হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি না হওয়াটা অলৌকিক ঘটনা।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্যারিস, মার্সেই, নিস, নঁত, বোর্দো, লিমোজ, লিল, তুলুজ ও স্ত্রাসবুর্গসহ বিভিন্ন শহরে দোকানপাটে লুটপাট চালানো হয়। এতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নগর অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। প্যারিসের মেয়র এমানুয়েল গ্রেগোয়ার বলেন, রাজধানীর বেশ কয়েকটি সড়কজুড়ে ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন দেখা গেছে।

লিমোজ শহরে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের দেওয়া আগুনে ১৪০ বছরের বেশি পুরোনো নগর ভবনটি প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। মার্সেই ও লিলের নগর ভবনেও হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া লিওঁ শহরে পর্যটন কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এসব ঘটনার জন্য দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করার এবং শাস্তি নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে সহিংসতা ও সরকারি-বেসরকারি সম্পদে হামলার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

বেলজিয়ামে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, পুলিশের জলকামান

বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধন ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে কয়েক সপ্তাহ ধরে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। শনিবারের বিক্ষোভেও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। বিক্ষোভকারীদের একাংশ পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছোড়ে এবং আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটায় বলে অভিযোগ উঠেছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে। দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় শহর লিয়েজেও বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে জলকামান ব্যবহারের খবর পাওয়া গেছে।

শিক্ষাব্যবস্থার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষের পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপও বিক্ষোভের পেছনে ভূমিকা রাখছে। শিক্ষা গ্রহণের খরচ সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা এবং শিক্ষার্থীদের আর্থিক চাপ কমানোর দাবি আন্দোলনে গুরুত্ব পাচ্ছে।

পর্তুগালে আবাসনসংকট ও কম মজুরি নিয়ে ক্ষোভ

পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি এবং বড় শহরগুলোতে আবাসনসংকটের প্রতিবাদে হাজারো মানুষ রাস্তায় নামেন। বিক্ষোভকারীরা মনে করছেন, আয় বৃদ্ধির তুলনায় বাসাভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ছে।

দেশটিতে আবাসনসংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ২০১৭ সালের পর থেকে পর্তুগালে বাড়ির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। নতুন চুক্তিতে বাসাভাড়াও প্রায় একই হারে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে তরুণ, শিক্ষার্থী ও স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য আবাসন জোগাড় করা কঠিন হয়ে উঠেছে।

দেশটির সংসদবিষয়ক মন্ত্রী কার্লোস আব্রেউ আমোরিম শুক্রবার বলেন, রাস্তায় স্লোগান দিয়ে সরকারকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে বাধ্য করা যাবে না। তবে বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, দেশের নীতিনির্ধারকেরা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার বাস্তবতা যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারছেন না। জীবনযাত্রার ব্যয় ও আবাসনসংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তারা।

ইতালিতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, আটক অর্ধশতাধিক নয়

ইতালির মিলানে যুদ্ধ ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে আয়োজিত একটি মিছিল প্রথমে শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরে সহিংসতায় রূপ নেয়। মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের একাংশ পুলিশের দিকে পাথর ও রাস্তার পাথরের খণ্ডসহ বিভিন্ন বস্তু ছুড়তে থাকে। এ সময় টেবিল ব্যবহার করে তৈরি করা ব্যারিকেডেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। ইতালির বার্তা সংস্থা লাপ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষে অন্তত দুই পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় প্রায় ৫০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকে অপ্রাপ্তবয়স্ক।

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে বলেন, বিক্ষোভ করা নাগরিক অধিকার হলেও শহরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া বা জনসম্পদের ক্ষতি করার অধিকার কারও নেই।

মিলানের মধ্য-বামপন্থী মেয়র জিউসেপ্পে সালাও বিক্ষোভের পেছনের কারণগুলোকে বোধগম্য বলে উল্লেখ করেছেন। তবে পুলিশের ওপর হামলা ও শহরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিকে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। এদিকে বোলোনিয়াতেও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের পাশাপাশি পাথর নিক্ষেপ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।

অর্থনৈতিক অসন্তোষ কি ছড়িয়ে পড়বে ইউরোপজুড়ে?

বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্স বর্তমানে বিক্ষোভের অন্যতম কেন্দ্র হলেও ইউরোপের অন্যান্য দেশেও জনঅসন্তোষের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। প্যারিসের এইচইসি বিজনেস স্কুলের ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন ও নীতিবিষয়ক অধ্যাপক আলবের্তো আলেমান্নোর মতে, গ্রিস, জার্মানি ও অস্ট্রিয়াতেও আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ের ইঙ্গিত রয়েছে। আগামী সপ্তাহগুলোতে এসব দেশে বিক্ষোভ আরও জোরালো হতে পারে।

তবে তাঁর মতে, চার দেশের বিক্ষোভকে একই আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং বিভিন্ন দেশে নিজস্ব পরিস্থিতি ও দাবি-দাওয়াকে কেন্দ্র করে পৃথক প্রতিবাদ হচ্ছে। তারপরও শিক্ষায় পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসনসংকট এবং পড়াশোনা শেষে কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মতো অভিন্ন উদ্বেগ এসব আন্দোলনের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, অর্থনৈতিক চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে তা শুধু সামাজিক অস্থিরতাই নয়, ইউরোপের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। সরকারের অর্থনৈতিক নীতি, শিক্ষা খাতে ব্যয়, আবাসনব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আগামী ১২ মাসে স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি ও পোল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এমন সময়ে জনঅসন্তোষ ও বিক্ষোভের বিস্তার রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী প্রচার, নীতিনির্ধারণ এবং ভোটারদের মনোভাবের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ফলে ইউরোপের সরকারগুলোর সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা, সাধারণ মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং একই সঙ্গে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা।