সারাবিশ্ব

গাজায় পণ্য প্রবেশ বন্ধে বাড়ছে খাদ্যের দাম, ভয়াবহ খাদ্যসংকটের শঙ্কা


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৭ এএম

গাজায় পণ্য প্রবেশ বন্ধে বাড়ছে খাদ্যের দাম, ভয়াবহ খাদ্যসংকটের শঙ্কা
ছবি: সংগৃহীত

ফিলিস্তিনের গাজায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম লাগামহীনভাবে বাড়ছে। বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশে ইসরায়েলের নিষেধাজ্ঞার কারণে টানা পাঁচ দিন ধরে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। এতে খাদ্যসংকটের আশঙ্কা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। অর্থের অভাবে অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় খাবার কিনে মজুত করতে পারছে না। ফলে বাড়ছে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ।

আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বুধবার থেকে গাজায় বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশ বন্ধের ঘোষণা দেয় ইসরায়েল। এরপর কয়েক দিনের ব্যবধানে আটা, ডিম, পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে খাদ্যসংকট আরও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

উত্তর গাজার জাবালিয়া এলাকার ৫২ বছর বয়সী বাসিন্দা ইসমাইল আল বারাওয়ি জানান, সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ হওয়ার দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যায়।

তিনি বলেন, আগে এক কার্টন ডিমের দাম ছিল ৩৫ ইসরায়েলি শেকেল, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৩৫০ টাকা। এখন একই পরিমাণ ডিম কিনতে খরচ হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ শেকেল, যা প্রায় ২ হাজার ৩৯১ থেকে ২ হাজার ৭৯০ টাকা। প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম পাঁচ থেকে ছয় শেকেল, অর্থাৎ প্রায় ২০০ থেকে ২৪০ টাকা থেকে বেড়ে আট থেকে ১০ শেকেলে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৩১৮ থেকে ৩৯৮ টাকা। অন্যদিকে, প্রতি কেজি অ্যাভোকাডোর দাম সাত থেকে আট শেকেল বা প্রায় ২৭৯ থেকে ৩১৮ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ১৫ শেকেল, অর্থাৎ ৫৯৭ টাকায় পৌঁছেছে।

আল বারাওয়ির ভাষ্য, মাত্র দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে এসব পণ্যের দাম বেড়েছে। সীমান্ত বন্ধ আরও ১০ থেকে ১৫ দিন অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

দাম বাড়ায় এখন প্রয়োজনীয় পণ্যও আগের তুলনায় কম কিনতে হচ্ছে তাকে। আগে এক কার্টন ডিম কিনলেও এখন চার থেকে পাঁচটি ডিম কিনেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে।

পরিবারের ১১ থেকে ১২ জন সদস্যের খাবারের ব্যবস্থা করতে হয় আল বারাওয়িকে। হাতে অর্থ এলে তিনি আটা, চাল, রান্নার তেল, পেঁয়াজ ও আলুর মতো প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার চেষ্টা করেন। তবে গাজার বহু পরিবারের হাতে বাড়তি খাবার কেনার মতো অর্থ নেই বলে জানান তিনি।

গাজার বাস্তুচ্যুত বাসিন্দা ৫০ বছর বয়সী ইমান আতাল্লাহ জানান, বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশ বন্ধ হওয়ার পর আটা কেনা তার পরিবারের জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

তার মতে, সীমান্ত বন্ধের আগে ৫০ কেজি আটার বস্তার দাম ছিল ২৫ থেকে ৩৫ শেকেল, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯৭৫ থেকে ১ হাজার ৩৬৫ টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৮০ শেকেলে পৌঁছেছে, যা প্রায় ৩ হাজার ১২০ টাকা।

পরিবারের সীমিত আয়ের কারণে প্রয়োজনীয় খাবার কিনতেও হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। সহায়তা হিসেবে পাওয়া আটা দিয়ে এক মাসেরও কম সময় চলে। দাম বেড়ে যাওয়ায় শিশুদের জন্য ডিম ও ফল কেনাও কমিয়ে দিতে হয়েছে।

ইমান আতাল্লাহ বলেন, তাদের পরিবার এখন মূলত চাল ও ডালের ওপর নির্ভর করছে। রুটিও কিনতে হচ্ছে সীমিত পরিমাণে। কোনো কোনো দিন সকালের নাশতা কিংবা রাতের খাবার বাদ দিয়ে শুধু দুপুরের খাবার খেয়েই থাকতে হচ্ছে তাদের।

তিনি বলেন, ‘আমাদের কোনো আয় নেই, তাই খাবার মজুত করতে পারছি না। সীমান্ত ক্রসিং ১০ থেকে ১৫ দিন বন্ধ থাকলে সবকিছুর দাম অত্যন্ত বেড়ে যাবে। যাদের টাকা আছে, তারা খাবার কিনে রাখবে। আর যাদের টাকা নেই, তাদের শুধু তাকিয়ে দেখা ছাড়া উপায় থাকবে না।’

গাজায় বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশ বন্ধের কারণ নিয়ে ইসরায়েল ও গাজার কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। ইসরায়েলের দাবি, ফিলিস্তিনি ব্যবসায়ী ও হামাসের মধ্যে ফি সংক্রান্ত বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে জানায়, বাণিজ্যিক ট্রাকের ওপর সরকারিভাবে কর বা ফি আরোপের অভিযোগ সঠিক নয়।

অফিসটির দাবি, ইসরায়েলের উল্লেখ করা ১০ হাজার শেকেলের অর্থ একটি স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক তহবিলের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর উদ্দেশ্য অসহায় পরিবারকে সহায়তা এবং আর্থিক ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা।

গাজার কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, এই বিরোধকে কাজে লাগিয়ে ইসরায়েল উপত্যকায় পণ্য প্রবেশের ওপর আরও বিধিনিষেধ আরোপ করছে। তারা মধ্যস্থতাকারী ও আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর প্রতি প্রতিদিন ৬০০টি ট্রাক প্রবেশ নিশ্চিত করতে চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছে।

২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে উপত্যকাটির অর্থনীতি ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘদিনের অবরোধ, আয় কমে যাওয়া এবং পণ্য প্রবেশে বিধিনিষেধের কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে গাজায় খাদ্যপণ্যের গড় দাম ২০২৩ সালের অক্টোবরের আগের সময়ের তুলনায় ২০৪ শতাংশ বেশি ছিল।

সূত্র, আল জাজিরা।