সারাবিশ্ব

বাবার শেষকৃত্যেও বৃদ্ধাশ্রমে এলেন না শিক্ষিত ৩ মেয়ে


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬, ১১:২৮ এএম

বাবার শেষকৃত্যেও বৃদ্ধাশ্রমে এলেন না শিক্ষিত ৩ মেয়ে
ছবিঃ সংগৃহীত

জীবনের পুরোটা সময় কঠোর পরিশ্রম করে তিন মেয়েকে উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এক বাবা। কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে সেই বাবাকেই কাটাতে হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমে নিঃসঙ্গ দিন। মৃত্যুর পরও শেষ বিদায়ে পাশে দাঁড়ানোর সময় বের করতে পারেননি তাঁর তিন কন্যা। 

ভারতের হরিয়ানার সোনিপতের একটি বৃদ্ধাশ্রমে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পারিবারিক বন্ধনের অবক্ষয় ও প্রবীণদের প্রতি দায়িত্ববোধ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে ঘটনাটি।

ভারতীয় গণমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছে, মুম্বাইয়ের সাবেক বস্ত্র ব্যবসায়ী শিবচরণ রাম রতন গুপ্ত গত প্রায় দুই বছর ধরে হরিয়ানার সোনিপতের একটি বৃদ্ধাশ্রমে বসবাস করছিলেন। স্ত্রী মীনা গুপ্তর মৃত্যুর পর তিনি সেখানে একাই জীবনযাপন করছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকার পর মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৩টার দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

বৃদ্ধাশ্রমের প্রশাসক আনন্দ কুমার জানান, সুস্থ থাকাকালে শিবচরণ গুপ্ত নিয়মিত আশ্রমের ফোন ব্যবহার করে মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতেন। কিন্তু অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হওয়ার পর ধীরে ধীরে মেয়েদের যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। মৃত্যুর প্রায় ২০ দিন আগে তাঁর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতির বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের জানানো হলেও কেউ তাঁকে দেখতে আসেননি।

জানা গেছে, শিবচরণ গুপ্ত নিজের তিন মেয়েকেই উচ্চশিক্ষিত করেছিলেন এবং তাঁদের সাফল্য নিয়ে গর্ব করতেন। বড় মেয়ে অনিতা নেপালে শিক্ষকতা করেন, মেজ মেয়ে নিশা ভারতের উত্তর প্রদেশের আজমগড়ে থাকেন এবং ছোট মেয়ে প্রিয়া মুম্বাইয়ে বসবাস করেন। বাবার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরও তাঁরা কেউ সোনিপতে যেতে পারবেন না বলে আশ্রম কর্তৃপক্ষকে জানান। ফলে বৃদ্ধাশ্রমের কর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারাই তাঁর শেষকৃত্যের সব আয়োজন সম্পন্ন করেন। নেপাল থেকে বড় মেয়ে অনিতা অনলাইনে ৫ হাজার ১০০ রুপি পাঠিয়ে বাবার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করার অনুরোধ জানান।

তবে পুরো ঘটনার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অংশটি সামনে আসে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময়। তিন মেয়েই ভিডিও কলের মাধ্যমে দূর থেকে বাবার শেষ বিদায় দেখছিলেন। এ সময় ফোনে তাঁদের একজনকে বলতে শোনা যায়, “এতে আর কতক্ষণ লাগবে? আমাদের তো খেতে ও স্নান করতে হবে।” বাবার চিতা যখন জ্বলছিল, তখন এমন মন্তব্য উপস্থিত সবার মধ্যে গভীর বেদনার সৃষ্টি করে।

এখানেই শেষ হয়নি অবহেলার অধ্যায়। প্রথমে বাবার চিতাভস্ম সংরক্ষণ করে রাখতে বললেও পরে মেয়েরা জানান, তাঁদের সোনিপতে যাওয়ার সময় হবে না। শেষ পর্যন্ত গঙ্গায় চিতাভস্ম বিসর্জনের দায়িত্বও বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষকেই পালন করতে অনুরোধ করেন তাঁরা।

তবে পুরো ঘটনাটির মধ্যেও একটি মানবিক দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন শিবচরণ গুপ্ত। পরিবারের সম্মতিতে মৃত্যুর পর তাঁর দুটি চোখ দান করা হয়। জীবনের শেষ সময়ে আপনজনদের সান্নিধ্য না পেলেও তাঁর এই মরণোত্তর চক্ষুদান অন্য এক দৃষ্টিহীন মানুষের জীবনে নতুন আলোর পথ খুলে দিতে পারে।

এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়; বরং আধুনিক সমাজে প্রবীণদের একাকীত্ব, পারিবারিক দায়বদ্ধতার সংকট এবং মানবিক সম্পর্কের পরিবর্তিত বাস্তবতার এক মর্মস্পর্শী প্রতিচ্ছবি হিসেবে আলোচনায় এসেছে।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে।