সারাবিশ্ব

গাজা যুদ্ধের প্রভাবে ইউরোপ থেকে দূরে ইসরায়েল, নির্বাচনে কি বদলাবে সম্পর্কের সমীকরণ?


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৩৫ পিএম

গাজা যুদ্ধের প্রভাবে ইউরোপ থেকে দূরে ইসরায়েল, নির্বাচনে কি বদলাবে সম্পর্কের সমীকরণ?
ছবি: সংগৃহীত

ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, ফিলিস্তিনিদের দুর্দশা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। একসময়কার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সঙ্গেও ইসরায়েলের মতপার্থক্য এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী ২৭ অক্টোবরের ইসরায়েলি নির্বাচন দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আনবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সরকার পরিবর্তন হলেও ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের সংকট দ্রুত কাটবে-এমন নিশ্চয়তা নেই।

২০২৩ সালে ইসরায়েলের ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন ইউরোপ ও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা তুলে ধরেছিলেন। বাণিজ্য, কূটনীতি, নিরাপত্তা সহযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও এই সম্পর্কের বিস্তৃতি ছিল। ইউরোপীয় ফুটবলে ইসরায়েলের অংশগ্রহণ, ইউরোভিশন সংগীত প্রতিযোগিতায় দেশটির উপস্থিতি এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ছিল সেই সহযোগিতার উল্লেখযোগ্য দিক। পাশাপাশি ইউরোপের প্রতিরক্ষা ও অস্ত্র উৎপাদন খাতের সঙ্গেও ইসরায়েলের সম্পর্ক রয়েছে।

কিন্তু গাজায় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার ঘটনায় সেই সম্পর্কের বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাপ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের মানবিক বিপর্যয়, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকার ও জনমতের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও এর প্রভাব পড়েছে। ইউরোভিশনে ইসরায়েলের অংশগ্রহণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে এবং কয়েকটি দেশ প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে ইসরায়েলের সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্ক এখন শুধু কূটনৈতিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়ছে সাংস্কৃতিক ও জনপরিসরেও।

ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইউরোপের অবস্থান কঠোর হচ্ছে

ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও ফিলিস্তিনিদের প্রতি আচরণের সমালোচনায় ইউরোপের কয়েকটি দেশ সরব ভূমিকা রেখেছে। আয়ারল্যান্ড ও স্পেন দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের অধিকার এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান জানিয়ে আসছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ গাজায় ইসরায়েলি সরকারের কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে, আয়ারল্যান্ডের সরকারও গাজার মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ইসরায়েলের নীতির সমালোচনা করেছে।

যুক্তরাজ্যও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ এবং বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। দেশটির নীতিগত পদক্ষেপের মধ্যে অবৈধ বসতি থেকে আসা পণ্যের ওপর বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগও রয়েছে। তবে ইউরোপের সব দেশ একই অবস্থানে নেই। জার্মানিসহ কয়েকটি দেশ ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রতি সমর্থন বজায় রেখেছে এবং দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক অব্যাহত রেখেছে। ফলে ইউরোপের অবস্থানকে একক নীতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং দেশভেদে তাদের অবস্থান ও পদক্ষেপে পার্থক্য রয়েছে।

নেতানিয়াহু আবার ক্ষমতায় এলে কী হতে পারে?

চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক ইয়োসি মেকেলবার্গের মতে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যদি কট্টর ডানপন্থী দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে আবার সরকার গঠন করেন, তাহলে ইউরোপের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক আরও অবনতির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন এবং গাজায় সামরিক নীতি নিয়ে মতবিরোধ আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক নিকোলা পেরুজিনিও মনে করেন, নেতানিয়াহু পুনর্নির্বাচিত হলে গাজার মানবিক সংকট ও ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কারণে নেতানিয়াহুর আন্তর্জাতিক সফর ও কূটনৈতিক যোগাযোগও জটিলতার মুখে রয়েছে।

তবে নেতানিয়াহুর পরিবর্তে অন্য কোনো নেতা ক্ষমতায় এলেই ইসরায়েলের ফিলিস্তিননীতি আমূল বদলে যাবে, এমন ধারণারও ভিত্তি নেই। বিরোধী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটসহ ইসরায়েলের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার অবস্থানেও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে সরকার পরিবর্তনের পাশাপাশি নতুন সরকারের নীতিগত অবস্থান, জোটের গঠন এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে বাস্তব পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে ইসরায়েলকে গাজার মানবিক পরিস্থিতির উন্নয়ন, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ বন্ধ বা সীমিত করা এবং ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু কূটনৈতিক বক্তব্য দিয়ে আস্থা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হতে পারে।

জনমতের চাপে বদলাচ্ছে ইউরোপের রাজনৈতিক হিসাব

গাজায় যুদ্ধবিরতির দাবি, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবাদ, শ্রমিক ও পেশাজীবী সংগঠনের অবস্থান এবং বিভিন্ন দেশে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভ ইউরোপের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলেছে। জনমতের পরিবর্তনের কারণে সরকারগুলোর ওপরও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক পর্যালোচনার চাপ বাড়ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকদের একাংশ।

যুক্তরাজ্যের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নেভে গর্ডনের মতে, ইউরোপের কয়েকটি দেশের সরকার এখন জনমতের সঙ্গে নিজেদের নীতিগত অবস্থানের সামঞ্জস্য আনার চেষ্টা করছে। তবে জনমতের পরিবর্তনই যে প্রতিটি দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একই ধরনের পরিবর্তন ঘটাবে, তা নিশ্চিত নয়। নিরাপত্তা, বাণিজ্য, ঐতিহাসিক সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক কৌশলও এসব সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখে।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৬ সালের বসন্তকালীন জরিপে ইসরায়েল সম্পর্কে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মানুষের নেতিবাচক মনোভাবের চিত্র উঠে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে ৬৯ শতাংশ, ইতালিতে ৭৫ শতাংশ এবং জার্মানিতে ৭৩ শতাংশ উত্তরদাতা ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা প্রকাশ করেছেন। ২০২৫ সালের তুলনায় যুক্তরাজ্যে এই হার ৮ শতাংশ, ইতালিতে ৯ শতাংশ এবং জার্মানিতে ৯ শতাংশ বেড়েছে। জরিপটি ২০২৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৩ মে পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে পরিচালিত হয়। এই ফলাফল ইসরায়েল সম্পর্কে জনমতের পরিবর্তন বোঝাতে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, একে সরাসরি প্রতিটি দেশের সরকারের নীতির প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। সূত্র: পিউ রিসার্চ সেন্টার।

নির্বাচনী প্রচারে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে?

ইসরায়েলের নির্বাচনী রাজনীতিতে নিরাপত্তা, হামাস ও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক কৌশল, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার সময় নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এর তুলনায় ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি নির্বাচনী বিতর্কে কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ইসরায়েলের অনেক ভোটারের কাছে নিরাপত্তা এখনো প্রধান রাজনৈতিক বিবেচনা। গাজা যুদ্ধ, আঞ্চলিক সংঘাত এবং ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার কারণে ভোটারদের একটি অংশ আন্তর্জাতিক সমালোচনার চেয়ে সামরিক সক্ষমতা ও নিরাপত্তার বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিতে পারেন। ফলে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও তা নির্বাচনে ভোটারদের সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটি নির্ভর করবে অন্যান্য অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক ইস্যুর ওপরও।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাবের বিস্তার স্পষ্ট হলেও, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ জনমত এবং ইউরোপীয় জনমত এক নয়। ইসরায়েলের ভোটাররা নিরাপত্তা, অর্থনীতি, সরকার পরিচালনা এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নকে ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করতে পারেন। তাই আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা নির্বাচনের ফলাফলে সরাসরি কী প্রভাব ফেলবে, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।

সরকার বদলালেই কি কাটবে কূটনৈতিক সংকট?

ইসরায়েল ও ইউরোপের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ শুধু নির্বাচনে কে সরকার গঠন করবে, তার ওপর নির্ভর করছে না। গাজায় যুদ্ধের পরিণতি, ফিলিস্তিনিদের মানবিক পরিস্থিতি, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাও এই সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে ইউরোপের সঙ্গে সংলাপ ও সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে নীতিগত পরিবর্তন না এলে শুধু নেতৃত্বের পরিবর্তন দিয়ে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস দূর করা কঠিন হবে। অন্যদিকে, বর্তমান সরকার পুনরায় ক্ষমতায় এলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বিদ্যমান মতবিরোধ আরও তীব্র হতে পারে-বিশেষ করে গাজা ও পশ্চিম তীর নিয়ে নীতির পরিবর্তন না ঘটলে।

সব মিলিয়ে, ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি ইউরোপের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কের ভবিষ্যৎ আলোচনাতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে সম্পর্কের সমীকরণ বদলাবে কি না, তার উত্তর শুধু নির্বাচনী ফলাফলে নয়; বরং নির্বাচনের পর গৃহীত নীতি, ফিলিস্তিনিদের অধিকার বিষয়ে পদক্ষেপ এবং ইউরোপের সঙ্গে ইসরায়েলের বাস্তব কূটনৈতিক আচরণে নিহিত থাকবে।