সারাবিশ্ব

প্রতিদিন ৫ হাজার সিঁড়ি পেরিয়ে মসজিদে যান ইমাম, পড়ান নামাজ


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪১ পিএম

প্রতিদিন ৫ হাজার সিঁড়ি পেরিয়ে মসজিদে যান ইমাম, পড়ান নামাজ
ছবি: সংগৃহীত

তুরস্কের পূর্বাঞ্চলের ভান প্রদেশে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক পাহাড়ি মসজিদে নামাজ পড়াতে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার সিঁড়ি পাড়ি দেন ইমাম সিগবাতুল্লাহ বিলমেজ। দুর্গম ও পাথুরে পাহাড়ি পথ পেরিয়ে প্রাচীন ভান দুর্গের চূড়ায় অবস্থিত মসজিদে পৌঁছান তিনি। সেখানে নিয়মিত নামাজের ইমামতি করার পাশাপাশি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের স্বাগত জানান এবং তুলে ধরেন মসজিদ ও আশপাশের এলাকার সমৃদ্ধ ইতিহাস।
তুরস্কের সংবাদমাধ্যম ‘ডেইলি সাবাহ এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ মাস ধরে ঐতিহাসিক সুলেমান হান মসজিদে ভারপ্রাপ্ত ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সিগবাতুল্লাহ বিলমেজ। প্রতিদিন ভানের আতাতুর্ক কালচারাল পার্ক থেকে যাত্রা শুরু করে প্রায় পাঁচ হাজার সিঁড়ি পেরিয়ে দুর্গের পাথুরে চূড়ায় পৌঁছান তিনি। প্রতিকূল ও কষ্টসাধ্য এই যাত্রা সত্ত্বেও দায়িত্ব পালনে কোনো অবহেলা করেন না তিনি।
প্রতিদিন মসজিদে পৌঁছে আজান দেওয়া, জামাতে নামাজ পড়ানো এবং দর্শনার্থীদের সঙ্গে কথা বলার কাজ করেন বিলমেজ। পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত মসজিদটিতে দায়িত্ব পালনের জন্য তাকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হলেও কাজের প্রতি তার আন্তরিকতা ও ভালোবাসা তাকে অনুপ্রাণিত করে।
মসজিদটির সঠিক নির্মাণকাল সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, ১৫৩৪ সালে উসমানীয় সাম্রাজ্যের সুলতান প্রথম সুলেমান, যিনি সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট নামেও পরিচিত, মসজিদটি সংস্কার করেছিলেন। দীর্ঘ সময় পর তিন বছর আগে মসজিদটি সংস্কার করে পুনরায় ইবাদতের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
তুরস্কের ধর্মবিষয়ক অধিদপ্তর এবং স্থানীয় মুফতি কার্যালয়ের অধীনে বিভিন্ন পদে প্রায় পাঁচ বছর দায়িত্ব পালনের পর সুলেমান হান মসজিদে দায়িত্ব পান বিলমেজ। নিজের প্রতিদিনের এই দীর্ঘ যাত্রা সম্পর্কে তিনি বলেন, পথটি বেশ ক্লান্তিকর হলেও তিনি আনন্দের সঙ্গেই দায়িত্ব পালন করেন। কারণ, নিজের ইচ্ছা ও আগ্রহ থেকেই তিনি এই কাজ বেছে নিয়েছেন।
বিলমেজ জানান, সাধারণত জোহরের নামাজের আগেই তিনি মসজিদে পৌঁছে যান। এরপর দিনের দায়িত্ব পালন শেষে মাগরিবের নামাজের পর পাহাড় থেকে নিচে নেমে আসেন। মসজিদটি জাদুঘর কর্তৃপক্ষের অধিভুক্ত হওয়ায় সেখানে ফজর ও এশার নামাজের জন্য নিয়মিত জামাত অনুষ্ঠিত হয় না।
নামাজের ইমামতি করার পাশাপাশি পর্যটকদের কাছে ঐতিহাসিক স্থাপনাটির গুরুত্ব তুলে ধরাও তার দায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভান দুর্গ দেখতে আসা পর্যটকদের অনেকেই সুলেমান হান মসজিদ পরিদর্শন করেন। এ সময় বিলমেজ তাদের মসজিদের ইতিহাস, প্রাচীন উরার্টীয় সভ্যতার দুর্গ এবং পুরোনো ভান শহরের ঐতিহাসিক নিদর্শন সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানান।
পর্যটকদের আগ্রহের বিষয়ে বিলমেজ বলেন, দর্শনার্থীরা শুধু দুর্গ দেখতে আসেন না; সুলতান সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টের সঙ্গে সম্পর্কিত ঐতিহাসিক সুলেমান হান মসজিদ দেখতেও তারা আগ্রহী। ফলে মসজিদটি ধর্মীয় উপাসনালয়ের পাশাপাশি ঐতিহাসিক ঐতিহ্য জানারও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হয়ে উঠেছে।
পর্যটকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের কারণে নিজের ইংরেজি ভাষার দক্ষতাও বেড়েছে বলে জানান বিলমেজ। এর ফলে বিদেশি দর্শনার্থীদের সঙ্গে আরও সহজে কথা বলতে পারেন তিনি। মসজিদ, উরার্টীয় দুর্গ ও পুরোনো ভানের ইতিহাস সম্পর্কে তাদের বিস্তারিত জানানোও এখন তার জন্য তুলনামূলক সহজ হয়েছে।
এ ছাড়া পর্যটকদের সঙ্গে ইসলাম ধর্ম নিয়ে প্রশ্নোত্তরভিত্তিক আলোচনায় অংশ নেন তিনি। এসব আলোচনার মাধ্যমে দর্শনার্থীরা ইসলাম সম্পর্কে জানার সুযোগ পান, অন্যদিকে বিলমেজও বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করতে পারেন। তার মতে, এ ধরনের আলোচনা উভয় পক্ষের জন্যই ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ।
প্রতিদিনের দীর্ঘ পথচলা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বিলমেজ জানান, পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে চারপাশের মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখলে তার ক্লান্তি অনেকটাই দূর হয়ে যায়। কষ্টসাধ্য পথ পেরিয়ে যখন তিনি মসজিদে পৌঁছান, তখন নিজের দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাওয়াকে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ হিসেবে দেখেন।
তিনি বলেন, পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে চারপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করার সময় এমন একটি সুন্দর ও মূল্যবান দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা অনুভব করেন তিনি। পাশাপাশি দর্শনার্থীদের কাছ থেকে দোয়া পাওয়া এবং তাদের মুখে ‘আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন’-এমন কথা শোনা তার কাছে অত্যন্ত সম্মান ও আনন্দের বিষয়।
দুর্গম পাহাড়ি পথ, হাজারো সিঁড়ি আর প্রতিদিনের শারীরিক পরিশ্রম-কোনো কিছুই দায়িত্ব পালনের প্রতি সিগবাতুল্লাহ বিলমেজের নিষ্ঠাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে পর্যটকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছেন ঐতিহাসিক সুলেমান হান মসজিদের এক নিবেদিতপ্রাণ সেবক।