সারাবিশ্ব
প্রেমের টানে সব বিক্রি করে ১২০০ মাইল পাড়ি, গিয়ে জানলেন প্রেমিকা এআই-নির্মিত
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়, সেখান থেকে প্রেম। সেই প্রেমকে বাস্তবে রূপ দিতে নিজের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র বিক্রি করে ১ হাজার ২০০ মাইলেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়েছিলেন ব্রাজিলের এক ব্যক্তি। স্বপ্ন ছিল, অনলাইনে পরিচিত প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করবেন এবং তাঁকে জীবনসঙ্গী করে নতুন জীবন শুরু করবেন। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছে জানতে পারেন, এত দিন ধরে যাঁর প্রেমে মজেছিলেন, বাস্তবে সেই নারীর কোনো অস্তিত্বই নেই। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি একটি কাল্পনিক চরিত্র।
নিউইয়র্ক পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রাজিলের ৪৯ বছর বয়সী এডিমার মার্টিন্স পেশায় একজন রাজমিস্ত্রি। টিভি মিরান্তেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ২০২০ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জেসিকা অলিভেইরা নামের একটি অ্যাকাউন্টের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। দীর্ঘদিন ধরে ওই অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যোগাযোগের একপর্যায়ে তিনি জেসিকাকে নিজের কাঙ্ক্ষিত জীবনসঙ্গী হিসেবে ভাবতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে তাঁর মনে ওই নারীর সঙ্গে সংসার গড়ার স্বপ্ন তৈরি হয়।
প্রেমিকার সঙ্গে সরাসরি দেখা করা এবং একসঙ্গে জীবন শুরু করার আশায় গত ৯ অক্টোবর নিজের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র বিক্রি করে বাসভাড়ার টাকা জোগাড় করেন মার্টিন্স। এরপর উত্তর-পূর্ব ব্রাজিলের মারানহাও রাজ্য থেকে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় মিনাস জেরাইস রাজ্যের রাজধানী বেলো হরিজন্তের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন তিনি। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ১১ অক্টোবর সেখানে পৌঁছে অনলাইনে পরিচিত প্রেমিকার খোঁজ করতে থাকেন।
কিন্তু এত দূর যাওয়ার পরও দেখা মেলেনি সেই নারীর। দীর্ঘক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর একপর্যায়ে স্থানীয় একটি রেডিও স্টেশনে গিয়ে জেসিকা অলিভেইরা সম্পর্কে জানতে চান মার্টিন্স। সেখানেই তিনি জানতে পারেন, জেসিকা নামে ওই নারীর বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে নারীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন, তিনি আসলে এআই প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি একটি কাল্পনিক চরিত্র।
এমন খবর জানার পর স্বাভাবিকভাবেই ভেঙে পড়ে মার্টিন্সের স্বপ্ন। অন্যদিকে, নিজের জিনিসপত্র বিক্রি করে যাত্রার খরচ জোগাড় করায় হাতে আর পর্যাপ্ত অর্থও ছিল না তাঁর। ফলে নতুন এক বিপাকে পড়েন তিনি। শেষ পর্যন্ত বেলো হরিজন্তে সিটি হলে গিয়ে এক সমাজকর্মীর কাছে নিজের পরিস্থিতির কথা জানান। পরে বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা পান তিনি।
সাক্ষাৎকারে মার্টিন্স জানান, দীর্ঘদিনের একাকিত্ব কাটিয়ে জীবনে ভালোবাসার একটি সম্পর্ক গড়ে তোলার আশাতেই তিনি এতটা পথ পাড়ি দিয়েছিলেন। তাঁর প্রত্যাশা ছিল, অনলাইনে পরিচিত ওই নারীকে কাছে পেয়ে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই আশা ভেঙে যায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেসিকা অলিভেইরা নামের ওই অ্যাকাউন্টটির অনুসারী ছিল প্রায় তিন লাখ। অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে এআই দিয়ে তৈরি নারী চরিত্রটিকে বলতে শোনা যায়, তিনি এমন একজন পুরুষের সন্ধান করছেন, যাঁকে নিজের খামারে নিয়ে গিয়ে আর্থিকভাবে দেখাশোনা করবেন। এ ধরনের উপস্থাপনা অনুসারীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছিল।
তবে পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত আরেকটি ভিডিওতে অ্যাকাউন্টটির পরিচালনাকারী স্বীকার করেন, জেসিকা বাস্তব কোনো নারী নন; বরং এআই প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি একটি কাল্পনিক চরিত্র। মার্টিন্সের সঙ্গে তাঁর কোনো সরাসরি যোগাযোগও হয়নি। পরিচালনাকারীর দাবি, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে অ্যাকাউন্টটির অনুসারী বাড়ানো এবং দর্শকদের সম্পৃক্ততা তৈরির লক্ষ্যেই এটি পরিচালনা করা হচ্ছিল।
এত কিছুর পরও ভালোবাসার প্রতি আশা হারাননি মার্টিন্স। বর্তমানে এক আত্মীয়ের সঙ্গে বসবাস করছেন তিনি। ভবিষ্যতে আবারও বেলো হরিজন্তে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। তবে এবার আর ভার্চুয়াল জগতের কোনো কাল্পনিক চরিত্র নয়, বাস্তব জীবনে একজন সঙ্গী খুঁজতে চান তিনি।
মার্টিন্সের এই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার গুরুত্বও সামনে এনেছে। এআই প্রযুক্তির সাহায্যে এখন বাস্তব মানুষের মতো দেখতে ছবি, ভিডিও ও চরিত্র তৈরি করা সম্ভব। তাই অনলাইনে কারও সঙ্গে আবেগের সম্পর্ক গড়ে তোলার আগে তাঁর পরিচয় ও বাস্তব অস্তিত্ব যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে অর্থ লেনদেন, ব্যক্তিগত সম্পদ বিক্রি কিংবা দূরপাল্লার ভ্রমণের মতো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।