সারাবিশ্ব

‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির মাশুল দিচ্ছেন সাধারণ মার্কিন নাগরিকরা


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪২ পিএম

‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির মাশুল দিচ্ছেন সাধারণ মার্কিন নাগরিকরা
ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ ও বাণিজ্যনীতির প্রভাব ক্রমেই মার্কিন নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর পড়ছে বলে দাবি করেছেন বিশ্লেষকেরা। জ্বালানি, গাড়ির ইঞ্জিন অয়েল, সার, খাদ্যপণ্য ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের পারিবারিক বাজেটে চাপ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে অর্থনৈতিক সংকট রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।

আল মায়াদিনে প্রকাশিত করিম শারারার এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যকার সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিণতি কী এবং এর সুফল কারা ভোগ করে-এই প্রশ্নের মধ্যেই আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের অবস্থানগত পার্থক্য বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র রয়েছে। পররাষ্ট্রনীতি সরাসরি ভোটারদের প্রধান উদ্বেগের বিষয় না হলেও এর অর্থনৈতিক প্রভাব নির্বাচনের ফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।

২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময়ও ভোটারদের প্রধান উদ্বেগের জায়গায় ছিল অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যসেবা। পররাষ্ট্রনীতি ছিল তুলনামূলকভাবে কম অগ্রাধিকার পাওয়া বিষয়গুলোর একটি। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক সংঘাত, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্যিক উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করলেও সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে সেই অর্থনীতিই। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, জ্বালানি ব্যয় এবং পরিবারের মাসিক খরচ সামলানো এখনো তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

প্রশ্ন উঠছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে পররাষ্ট্রনীতির ভূমিকা থাকলেও ভোটারদের আলোচনায় তা তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পায় কেন? ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও পণ্যবাজারের সরবরাহব্যবস্থায় পরিবর্তন এনেছিল। অন্যদিকে ইরানকে ঘিরে সংঘাত এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহপথে বিঘ্নের আশঙ্কা বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ ভোক্তাদের ব্যয়েও পড়তে পারে। অর্থাৎ, যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত বিবেচনায়, কিন্তু তার আর্থিক বোঝা বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকেও।

যুদ্ধের প্রভাব এবার পৌঁছেছে দৈনন্দিন কেনাকাটায়

যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য সংকটের একটি বড় দিক হলো, যুদ্ধ ও বাণিজ্যনীতির প্রভাব এমন সব পণ্যের দামে পড়ছে, যেগুলোকে সাধারণত অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির বিষয় বলে মনে করা হয়। গাড়ি সচল রাখা, ইঞ্জিন অয়েল কেনা, বাজার করা কিংবা অনলাইনে অর্ডার করা পণ্য বাড়িতে পৌঁছানোর খরচ-সব ক্ষেত্রেই সরবরাহব্যবস্থার ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম বাড়লে তার প্রভাব পরিবহন, উৎপাদন এবং খুচরা বিক্রির বিভিন্ন ধাপে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রতিবেদনে গাড়ির ইঞ্জিন অয়েলের বাজারকে এ সংকটের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের সময় কাতারের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সিনথেটিক লুব্রিকেন্ট উৎপাদনে ব্যবহৃত ‘গ্রুপ থ্রি বেস অয়েল’-এর সরবরাহ ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে অন্যান্য উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটে। ফলে এই শিল্পের উৎপাদন ও বাজারব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়।

প্রতিবেদনে তথ্য সংস্থা আর্গাসের বরাতে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বেস অয়েলের দাম প্রায় চার গুণ বেড়ে প্রতি গ্যালন ১২ দশমিক ৪৫ ডলারে পৌঁছায়। গত মার্চ থেকে লুব্রিকেন্টের দাম ৬০ শতাংশ বাড়ার পর অটোমোবাইল পরিষেবা প্রতিষ্ঠান ভালভোলিন ইঞ্জিন অয়েল পরিবর্তনের খরচ ৫ থেকে ৭ ডলার পর্যন্ত বাড়িয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া কস্টকোর ১০ কোয়ার্টের একটি সিনথেটিক অয়েল প্যাকেজের দাম ৫৭ দশমিক ৯৯ ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছর প্রায় ৩০ ডলারের কাছাকাছি ছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সরবরাহের সীমাবদ্ধতার কারণে ক্রেতাপ্রতি কেনার পরিমাণেও বিধিনিষেধ আরোপের কথা উল্লেখ রয়েছে।

ইঞ্জিন অয়েলের মতো পণ্যের দাম বাড়ার বিষয়টি অনেকের কাছে ছোটখাটো ব্যয় বৃদ্ধি মনে হতে পারে। কিন্তু গাড়ির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ যাদের জন্য অপরিহার্য, তাদের ক্ষেত্রে এ ধরনের অতিরিক্ত খরচ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ সীমিত। বিশেষ করে কর্মস্থলে যাতায়াত কিংবা জীবিকা নির্বাহের জন্য গাড়ির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোকে এই বাড়তি অর্থ অন্য খাতের ব্যয় কমিয়ে জোগাড় করতে হয়। ফলে একটি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিও পারিবারিক বাজেটের অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে প্রভাব ফেলতে পারে।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে চাপে পরিবার ও পরিবহন খাত

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিও মার্কিন নাগরিকদের অর্থনৈতিক চাপের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) বরাতে এএএ-র অক্টোবরের তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম প্রতি গ্যালনে ৪ দশমিক ৩৩ ডলারে পৌঁছেছে, যা যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় ৪৫ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ডিজেলের দাম ৬৮ শতাংশ বেড়ে প্রতি গ্যালনে ৬ দশমিক ৩৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু ডিজেলচালিত গাড়ির মালিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য পরিবহনব্যবস্থার একটি বড় অংশ ডিজেলনির্ভর হওয়ায় এর দাম বাড়লে খাদ্যপণ্য, গৃহস্থালির সামগ্রী এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনের খরচও বাড়তে পারে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো এই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত করলে শেষ পর্যন্ত তার বোঝা গিয়ে পড়ে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর।

এ পরিস্থিতিতে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় খরচের মধ্যে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হচ্ছে। কেউ গাড়ির সার্ভিসিং পিছিয়ে দিচ্ছেন, কেউ অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত কমাচ্ছেন, আবার কেউ দৈনন্দিন কেনাকাটায় কাটছাঁট করছেন। তবে গাড়ির ওপর নির্ভরশীল মানুষের পক্ষে দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণ এড়িয়ে চলাও সম্ভব নয়। কারণ, গাড়ি অচল হয়ে পড়লে অনেকের কর্মস্থলে যাতায়াত ও উপার্জন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে জ্বালানির বাড়তি খরচ একদিকে যেমন সরাসরি ব্যক্তিগত ব্যয় বাড়ায়, অন্যদিকে তেমনি জীবিকা নির্বাহের সক্ষমতাকেও চাপে ফেলে।

কৃষি ও খাদ্যপণ্যের দামেও পড়তে পারে প্রভাব

জ্বালানি সংকটের প্রভাব কৃষি খাতেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইউরিয়াসহ বিভিন্ন নাইট্রোজেন সার উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাস গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে তেল ও গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে পাওয়া সালফার ফসফেট সার তৈরিতে ব্যবহৃত সালফিউরিক অ্যাসিড উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ফলে জ্বালানি ও কাঁচামালের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে সার উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে।

আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইএফপিআরআই) পর্যবেক্ষণের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট সরবরাহসংক্রান্ত বাধা সার ও জ্বালানির বাজারকে প্রভাবিত করতে পারে। কৃষকদের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে তার প্রভাব শস্য উৎপাদন থেকে শুরু করে পশুখাদ্য, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হিমাগারে সংরক্ষণ এবং পরিবহন পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।

এর ফলে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। কৃষকের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেলে তা সব সময় কৃষক নিজে বহন করতে পারেন না; অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদিত পণ্যের বিক্রয়মূল্য বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দেয়। একইভাবে পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যয় বাড়লে খুচরা বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামলাতে হয় সাধারণ ভোক্তাদেরই। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক সংঘাতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই বলে মনে হওয়া খাদ্যপণ্যের বাজারও বৈশ্বিক জ্বালানি ও কাঁচামালের সংকট থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।

রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা ও নীতিগত দ্বন্দ্ব

ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের গতিপথ বদলে দেয়। ইউরোপ রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প খুঁজতে শুরু করে, অন্যদিকে রাশিয়াও নতুন বাজারে জ্বালানি বিক্রির সুযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহের ধরন, বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জ্বালানির বাজারে চাপ বাড়ার পর মার্কিন ট্রেজারি রাশিয়ার ডিজেলসংক্রান্ত কিছু লেনদেনে সাময়িক অনুমোদন দেয়। বিশ্লেষকের মতে, নির্বাচনের আগে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি রাজনৈতিক চাপ তৈরি করায় ওয়াশিংটনকে আগের নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয় হতে হয়েছে। তবে এ ধরনের পদক্ষেপের পেছনে জ্বালানি সরবরাহ, বাজারের স্থিতিশীলতা এবং রাজনৈতিক বিবেচনা-একাধিক বিষয় কাজ করতে পারে।

এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থানের একটি দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দেশটির জ্বালানি বাণিজ্য সীমিত করার চেষ্টা করা হয়েছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণের চাপ বাড়লে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার প্রয়োজন দেখা দেয়। ফলে পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্ত এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা ওয়াশিংটনের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।

ট্রাম্পের শুল্কনীতিতে বাড়তি ব্যয়ের চাপ

জ্বালানি ও যুদ্ধসংক্রান্ত অনিশ্চয়তার পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতিও সাধারণ ভোক্তাদের ব্যয় বৃদ্ধির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আমদানিপণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের উদ্দেশ্য হিসেবে দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার কথা বলা হলেও, এর ফলে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। প্রতিষ্ঠানগুলো সেই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দিলে বাজারে পণ্যের দামও বাড়তে পারে।

প্রতিবেদনে নিউইয়র্ক ফেডের গবেষণার বরাতে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ সালের শুল্কনীতি ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যেই জ্বালানিবহির্ভূত ভোগ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতিতে অতিরিক্ত ২ দশমিক ৯ শতাংশ পয়েন্ট যোগ করেছে। মূল্যস্ফীতির হার কমতে শুরু করলেও এর অর্থ এই নয় যে আগে বেড়ে যাওয়া পণ্যের দাম আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। মূল্যস্ফীতির গতি কমার অর্থ সাধারণত দাম আগের তুলনায় ধীরগতিতে বাড়ছে; দাম কমছে, এমন নয়।

এই পার্থক্যটি সাধারণ পরিবারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পণ্যের দাম একবার বেড়ে গেলে আয় একই হারে না বাড়ার কারণে পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে। ফলে মূল্যবৃদ্ধির গতি কমলেও আগের ব্যয়ের চাপ থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ হয় না। এ কারণে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি বাস্তবে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের আর্থিক স্বস্তি দিতে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব বুঝছেন ভোটাররা, তবু সমর্থনে বিভাজন

যুদ্ধ ও শুল্কনীতির অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে মার্কিন ভোটারদের মনোভাবও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতিবেদনে শিকাগো কাউন্সিল ও ইপসোসের একটি জরিপের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ৮৬ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিক মনে করেন, ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এ মত পোষণকারীদের মধ্যে ৭৬ শতাংশ রিপাবলিকান এবং ৮৯ শতাংশ স্বতন্ত্র ভোটার রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

একইভাবে, জুলাইয়ে পরিচালিত শিকাগো কাউন্সিলের আরেকটি জরিপে ৮১ শতাংশ উত্তরদাতা শুল্কনীতিকে জীবনযাত্রার ব্যয়ের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করেছেন। তাঁদের মধ্যে রিপাবলিকান সমর্থকেরাও রয়েছেন। তা সত্ত্বেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ৬৩ শতাংশ রিপাবলিকান ইরান যুদ্ধকে সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন।

এই পরিসংখ্যান রাজনৈতিক মনোভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। কোনো নীতির অর্থনৈতিক ক্ষতি সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং সেই নীতিকে রাজনৈতিকভাবে প্রত্যাখ্যান করা এক বিষয় নয়। একজন ভোটার যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে বলে মনে করলেও জাতীয় নিরাপত্তা, দলীয় আনুগত্য কিংবা রাজনৈতিক আদর্শের কারণে যুদ্ধকে সমর্থন করতে পারেন। ফলে অর্থনৈতিক অসন্তোষ সব সময় ক্ষমতাসীন দলের প্রতি সমর্থন কমিয়ে দেয় না।

মূলত রাজনৈতিক প্রচারণা, গণমাধ্যমে উপস্থাপিত বক্তব্য এবং দলীয় পরিচয় ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলতে পারে। একই অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে একজন ভোটার সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে দেখতে পারেন, আবার অন্য কেউ সেটিকে জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজনীয় ত্যাগ হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। এই পার্থক্যই অর্থনৈতিক সংকটকে রাজনৈতিক পরিবর্তনে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

জীবনযাত্রার ব্যয়ের জন্য ট্রাম্পকে দায়ী করছেন অনেকে

প্রতিবেদনে এপি-নোরকের সেপ্টেম্বরের একটি জরিপের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ৬৫ শতাংশ উত্তরদাতা বর্তমান উচ্চমূল্যের জন্য ট্রাম্পের নীতিকে দায়ী করেছেন। অন্যদিকে, রিপাবলিকানদের মধ্যে ৬৭ শতাংশ মনে করেন, মূল্যবৃদ্ধির পেছনে এমন কিছু কারণ রয়েছে, যেগুলো ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

বাস্তবে মূল্যবৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। আন্তর্জাতিক সংঘাত, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, শুল্ক, পরিবহন ব্যয় এবং বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তন—সবকিছুই বিভিন্ন মাত্রায় ভূমিকা রাখতে পারে। তাই প্রতিটি মূল্যবৃদ্ধিকে কেবল একটি নীতির ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যথাযথ নয়। তবে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত বাজারের ওপর কী প্রভাব ফেলছে, তা মূল্যায়ন করা এবং সেই সিদ্ধান্তের জন্য রাজনৈতিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এখানেই ট্রাম্পের সমর্থকদের মনোভাব নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের মতে, কিছু রিপাবলিকান সমর্থক মূল্যবৃদ্ধির কারণে অসন্তুষ্ট হলেও এর দায় প্রেসিডেন্টের ওপর দিতে চান না। তাঁদের কাছে অর্থনৈতিক ক্ষতি স্বীকার করার পরও যুদ্ধ বা শুল্কনীতিকে সমর্থন করার পেছনে রাজনৈতিক বিশ্বাস ও দলীয় আনুগত্য বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মধ্যে একটি ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে অর্থনীতিই হতে পারে বড় নির্ধারক

যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয় বড় নির্বাচনী ইস্যু হয়ে উঠতে পারে বলে প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। শিকাগো কাউন্সিলের জুলাইয়ের জরিপে ৩৭ শতাংশ ভোটার মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়কে তাঁদের প্রধান নির্বাচনী উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। বিপরীতে, মাত্র ২ শতাংশ ভোটার ইরান যুদ্ধকে তাঁদের প্রধান উদ্বেগ হিসেবে উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে, প্রতিবেদনে এপি-নোরকের অক্টোবরের জরিপের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, একাধিক বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বেছে নেওয়ার সুযোগ পেয়ে ৮৫ শতাংশ ভোটার অর্থনীতি এবং ৮৪ শতাংশ জীবনযাত্রার ব্যয়কে প্রধান সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই জরিপে ৭৯ শতাংশ ভোটার জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, ভোটাররা সরাসরি যুদ্ধকে নির্বাচনের প্রধান ইস্যু হিসেবে না দেখলেও যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব তাঁদের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখতে পারে। একজন কৃষক হয়তো আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা সার উৎপাদনের জটিল সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত জানেন না, কিন্তু সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাঁর উৎপাদন খরচ বাড়লে তিনি অসন্তুষ্ট হতে পারেন। একইভাবে, একজন গাড়িচালক আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের পরিস্থিতি না বুঝলেও পেট্রলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন।

অর্থাৎ, পররাষ্ট্রনীতি ভোটারদের অগ্রাধিকারের তালিকায় সরাসরি শীর্ষে না থাকলেও এর আর্থিক পরিণতি নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। ট্রাম্প নিজে মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রার্থী না হলেও তাঁর দলের কংগ্রেস সদস্যরা প্রশাসনের নীতি নিয়ে জনঅসন্তোষের মুখোমুখি হতে পারেন।

ডেমোক্র্যাটদের সামনে সুযোগ, তবে বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন

ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনাকে কাজে লাগিয়ে ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছে। প্রতিবেদনে এপির তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ কংগ্রেসীয় আসনগুলোতে ইরান-সংক্রান্ত ৬৫টি বিজ্ঞাপনের মধ্যে ৬১টিতে গৃহস্থালি ব্যয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সেপ্টেম্বর থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত এসব বিজ্ঞাপন ৪৩ হাজারেরও বেশি বার সম্প্রচার করা হয়েছে এবং এর পেছনে আনুমানিক ৪২ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই প্রচারণার মূল কৌশল হলো, আন্তর্জাতিক যুদ্ধ ও পররাষ্ট্রনীতির মতো জটিল বিষয়কে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত করে উপস্থাপন করা। এতে ভোটারদের কাছে যুদ্ধের অর্থনৈতিক পরিণতি আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হতে পারে। জ্বালানি, খাদ্যপণ্য এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধিকে সামনে রেখে ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতাসীন দলের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

তবে রিপাবলিকানদের নির্বাচনী ক্ষতি হলেই ডেমোক্র্যাটদের প্রতি জনগণের আস্থা বেড়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। প্রতিবেদনে এপি-নোরকের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকের একটি জরিপের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, নিবন্ধিত ভোটারদের ২৭ শতাংশই জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানোর ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক দলকেই যথেষ্ট বিশ্বাস করতে পারছেন না।

এ পরিস্থিতিতে ডেমোক্র্যাটদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে শুধু ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনা করা নয়, বরং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি ব্যয় কমানো এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা তুলে ধরা। কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও তারা এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারবে কি না, সেটিই শেষ পর্যন্ত তাদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।

সব মিলিয়ে, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির বাস্তব ফলাফল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন-জাতীয় স্বার্থ রক্ষার নামে নেওয়া যুদ্ধ ও বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের আর্থিক বোঝা শেষ পর্যন্ত কারা বহন করছে? আন্তর্জাতিক রাজনীতির সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা হয়তো কৌশলগত সুবিধা বা নিরাপত্তাগত অর্জনের কথা বলবেন, কিন্তু সাধারণ নাগরিকদের কাছে সাফল্যের মূল্যায়ন অনেকটাই নির্ভর করে তাঁদের দৈনন্দিন জীবন কতটা সাশ্রয়ী থাকছে তার ওপর।

আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটাররা এই অর্থনৈতিক চাপকে কতটা রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্নে পরিণত করবেন, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট-পররাষ্ট্রনীতির প্রভাব কেবল যুদ্ধক্ষেত্র বা কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ থাকে না। তার প্রতিফলন দেখা যায় পেট্রল পাম্পে, সুপারশপের বিলের কাগজে, কৃষকের উৎপাদন খরচে এবং পরিবারের মাসিক বাজেটে। ডেমোক্র্যাটরা যদি এই অসন্তোষকে কার্যকর রাজনৈতিক পরিবর্তনে রূপ দিতে চায়, তবে তাদেরও প্রমাণ করতে হবে যে সমালোচনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বাস্তবসম্মত বিকল্প তাদের হাতে রয়েছে।