সারাবিশ্ব

ইরান যুদ্ধের জ্বালানি সংকটের বড় ধাক্কা এখনও আসেনি, সতর্ক করল কাতার


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩৮ পিএম

ইরান যুদ্ধের জ্বালানি সংকটের বড় ধাক্কা এখনও আসেনি, সতর্ক করল কাতার
ছবি: সংগৃহীত

ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতিতে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব এখনও সামনে আসেনি বলে সতর্ক করেছেন কাতারের উপপ্রধানমন্ত্রী শেখ সৌদ বিন আবদুর রহমান আল থানি। আগামী দিন ও মাসগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর এই সংঘাতের প্রভাব আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।

সোমবার দোহায় অনুষ্ঠিত গ্লোবাল সিকিউরিটি ফোরামে বক্তব্য দিতে গিয়ে কাতারের প্রতিরক্ষাবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বেও থাকা আল থানি বলেন, জ্বালানি খাতের সংকট এখনও চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তাঁর ভাষায়, “জ্বালানির ক্ষেত্রে আমরা এখনও সংকটের চূড়ায় পৌঁছাইনি।” আগামী দিন ও মাসগুলোতে এই সংকটের আরও গুরুতর প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি। একই সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব এবং জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন কাতারের এই শীর্ষ কর্মকর্তা।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং এর জবাবে তেহরানের পাল্টা আঞ্চলিক হামলার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অস্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) উল্লেখযোগ্য অংশ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ কমে যাওয়া, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের সাধারণ ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপরও পড়তে পারে।

এদিকে, গত মার্চে কাতারের রাস লাফান শিল্পাঞ্চলে ইরানের হামলায় বেশ কয়েকটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গুরুত্বপূর্ণ এই শিল্পাঞ্চল দেশটির জ্বালানি উৎপাদন ও রপ্তানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো মেরামত করতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। হামলার বিষয়ে জানতে চাইলে আল থানি বলেন, তাঁরা ওই ঘটনায় বিস্মিত হয়েছিলেন। তবে হামলার পর ইরানের সঙ্গে এ বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এ ধরনের হামলার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে কাতার এখন দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও অবকাঠামোর নিরাপত্তা আরও জোরদার করছে। আল থানি বলেন, অপ্রত্যাশিত হামলা থেকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে সুরক্ষিত রাখা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু কাতারের অর্থনীতির জন্য নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালিতে শুল্ক আরোপের বিরোধিতা

হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর ট্রানজিট ফি বা চলাচল শুল্ক আরোপের বিরোধিতা করেছেন কাতারের উপপ্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের শুল্ক আরোপ করা উচিত নয়। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও নৌ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম ও পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার মাধ্যমে সাধারণ ভোক্তাদেরও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘ সময় ধরে অচলাবস্থা বা চলাচলে বিধিনিষেধ তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ বাড়তে পারে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানার কার্যক্রম, পরিবহন এবং আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। যদিও সংকটের প্রকৃত মাত্রা নির্ভর করবে সংঘাতের স্থায়িত্ব, জাহাজ চলাচলের পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কূটনৈতিক পদক্ষেপের ওপর।

ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে কাতার

যুদ্ধ ও পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যেও ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে কাতার। আল থানি জানান, দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা ও যোগাযোগ চলছে। তাঁর মতে, প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য যোগাযোগের পথ খোলা রাখা অত্যন্ত জরুরি।

যুদ্ধের আগে ইরানের সঙ্গে কাতারের সম্পর্ক আস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। দুই দেশের যৌথ সামুদ্রিক গ্যাসক্ষেত্র এবং দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক স্বার্থের বিষয়টিও তুলে ধরেন কাতারের উপপ্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, পারস্পরিক স্বার্থ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর সুযোগ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরায়েলসহ সংঘাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় কাতার, পাকিস্তান ও ওমানের মধ্যস্থতা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন আল থানি। তবে তাঁর মতে, শুধু সাময়িক সমঝোতা দিয়ে সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক সংলাপ ও পারস্পরিক আস্থা।

এ ক্ষেত্রে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্যদেশগুলোর পাশাপাশি পাকিস্তান ও তুরস্ককে আলোচনায় যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মিত্রদের সঙ্গে পরামর্শের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য আঞ্চলিক নিরাপত্তাকাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। আল থানি বলেন, “আমাদের আস্থার ভিত্তিতে এগোতে হবে।”

ভবিষ্যতে সংঘাত এড়াতে ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের পক্ষেও মত দেন কাতারের উপপ্রধানমন্ত্রী। উদাহরণ হিসেবে ফ্রান্স ও জার্মানির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের বৈরিতার পর দেশ দুটি অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের সম্পর্ক উন্নত করেছে। তাঁর মতে, প্রতিবেশী হিসেবে ইরানের সঙ্গে সহাবস্থানের পথ খুঁজে বের করা জরুরি। তিনি বলেন, “ইরান আমাদের প্রতিবেশী। তাদের সঙ্গে কীভাবে বসবাস করা যায়, সেই পথ আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।”

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করছে কাতার

আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়টিও তুলে ধরেন আল থানি। তাঁর দাবি, গত তিন থেকে চার দশকে যৌথ অভিজ্ঞতা ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে ৯০ শতাংশের বেশি হামলা প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে। কাতারের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের অংশীদার দেশগুলোর সেনাসদস্যদের অবস্থানস্থল আল উদেইদ বিমানঘাঁটির উন্নয়নকাজ অব্যাহত রয়েছে বলে জানান কাতারের উপপ্রধানমন্ত্রী। চলমান সংঘাতের সময় ইরান এই ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছিল। মার্চের শুরুর দিকে একটি হামলার সময় দুটি ইরানি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার কথাও জানিয়েছিল কাতার।

এ ছাড়া আকাশ প্রতিরক্ষা, ড্রোনবিরোধী প্রযুক্তি এবং সাইবার নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন একটি আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান আল থানি। তবে এই উদ্যোগে কোন কোন দেশ অংশ নিতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি তিনি।

কাতারের উপপ্রধানমন্ত্রী বলেন, আঞ্চলিক সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক মধ্যস্থতা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রস্তুতিও থাকতে হবে। তাঁর ভাষায়, “মধ্যস্থতা করার অর্থ এই নয় যে নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য যেকোনো পদক্ষেপ নিতে আমরা প্রস্তুত থাকব না।”

সব মিলিয়ে, ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে কাতার। জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা, হরমুজ প্রণালিতে নির্বিঘ্নে জাহাজ চলাচল এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক সংলাপকে তাই সংকট মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখছেন দেশটির নেতারা।