সারাবিশ্ব

ডেমোক্র্যাটরা জিতলে যুক্তরাষ্ট্রেও ফ্রান্সের মতো সহিংসতা ছড়াবে: ট্রাম্প


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫৬ এএম

ডেমোক্র্যাটরা জিতলে যুক্তরাষ্ট্রেও ফ্রান্সের মতো সহিংসতা ছড়াবে: ট্রাম্প
ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচনে জয়ী হলে দেশটিতে ফ্রান্সের মতো সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার কানসাসে এক নির্বাচনী সমাবেশে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার চালানোর সময় তিনি এ আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তবে তার এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি ট্রাম্প। সমাবেশে অভিবাসন, মুসলমান, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিয়েও বিতর্কিত মন্তব্য করেন তিনি।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালের পক্ষে প্রচার চালাতে কানসাসে যান ট্রাম্প। দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই রাজ্যে এবার মার্শালকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিলটনের কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। রক্ষণশীল রাজ্যগুলোতে রিপাবলিকান প্রার্থীদের প্রতি সমর্থন জোরদার করার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিভিন্ন রাজ্যে রিপাবলিকান প্রার্থীরা চাপে রয়েছেন। সমাবেশে বক্তব্যের শুরুতে ট্রাম্প বলেন, ‘কানসাস, আমি তোমাদের ভালোবাসি। তবে আমি এখানে রজার মার্শাল নামের একজনের জন্য এসেছি।’ এরপর তিনি ফ্রান্সের সাম্প্রতিক অস্থিরতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন।

ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি পরিষেবায় অর্থসংকটকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে বিক্ষোভ হয়েছে। এসব বিক্ষোভের কিছু ঘটনায় সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে বলে উল্লেখ করেন ট্রাম্প। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় এলে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের দেশে এমনটা ঘটতে দেব না। ফ্রান্সে যখন গির্জার চূড়ায় আগুন জ্বলতে এবং চারদিকে আগুনের লেলিহান শিখা দেখতে পাবে, তখন মনে রেখো, কট্টর ডেমোক্র্যাটরা আমেরিকার সঙ্গে এমনটাই করতে চায়।’

ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের সময় যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য ও পরিষেবার মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার চাপও তার প্রশাসনের ওপর বাড়ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ নির্বাচনী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে অভিবাসী ও মুসলমানদের নিয়ে ট্রাম্পের নেতিবাচক মন্তব্যও নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অধিকারকর্মী ও নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এ ধরনের বক্তব্য বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক মনোভাবকে উসকে দিতে পারে। ডেমোক্র্যাটদের বিদ্রূপ করতেও ট্রাম্প ‘ডুমোক্র্যাটস’ শব্দটি ব্যবহার করেন।

২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কানসাসে ১৬ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন ট্রাম্প। গত ৯৪ বছরে এই রাজ্য থেকে কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে নির্বাচিত হননি। তবে এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালকে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে হতে পারে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাডাম হ্যামিলটন একটি বড় মেথডিস্ট গির্জার যাজক। তিনি ট্রাম্পের শুল্কনীতির বিরোধিতা করেছেন এবং প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বকে ‘খামখেয়ালি’ বলে সমালোচনা করেছেন।

হ্যামিলটনকে আক্রমণ করে ট্রাম্প বলেন, ‘শ্বেতাঙ্গ হয়ে জন্মানোর জন্য তিনি চান আপনারা অনুতপ্ত হন।’ অন্যদিকে, সমাবেশে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইস্যুগুলো সামনে আনেন সিনেটর মার্শাল। তিনি ‘কট্টর ইসলামের’ বিস্তার ঠেকানোর দাবি জানান এবং সমকামীদের অধিকার ও গর্বের মিছিলের প্রতি সমর্থন দেওয়ায় হ্যামিলটনকে কানসাসের জন্য ‘অতিরিক্ত উদারপন্থী’ বলে আখ্যা দেন। এ সময় সমাবেশে উপস্থিত লোকজন দুয়োধ্বনি দেন।

মার্শাল বলেন, ‘আমাদের এমন একজনকে দরকার, যিনি গরু ও ষাঁড় সামলাতে পারেন।’ তার এই মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে হ্যামিলটনের নির্বাচনী প্রচারশিবির তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে সোমবার প্রকাশিত একটি ভিডিওতে হ্যামিলটন ট্রাম্পকে কানসাসে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, ট্রাম্পের সমর্থকেরাও তার নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে পারেন। যেসব বিষয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করা সম্ভব, সেসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতেও তিনি আগ্রহী। তবে ওয়াশিংটনের নীতির কারণে কৃষক ও গ্রামীণ এলাকার হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হলে কানসাসের মানুষের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা রিপাবলিকানদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। দলটি সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে চায়। এ লক্ষ্য সামনে রেখে ট্রাম্প টানা ৩২ দিন ধরে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যেসব এলাকায় তিনি বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন, সেসব এলাকায় বারবার যাচ্ছেন তিনি।

ট্রাম্পের নির্বাচনী কৌশল সম্পর্কে অবগত এক রিপাবলিকান নেতার ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ এলাকায় প্রেসিডেন্টের বাড়তি মনোযোগের পেছনে দলের অভ্যন্তরীণ জনমত জরিপের ফল রয়েছে। ওই জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রামীণ অঞ্চলে ৫৫ বছর বা তার কম বয়সী পুরুষদের মধ্যে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন কিছুটা কমেছে। অথচ ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার জয়ের পেছনে এই ভোটারদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

সোমবার প্রকাশিত রয়টার্স ও ইপসোসের একটি জনমত জরিপেও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের কাজের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন মাত্র ৩১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক। তার বর্তমান মেয়াদে এটিই সর্বনিম্ন সমর্থনের হার বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কংগ্রেসের উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পেতে ডেমোক্র্যাটদের প্রতিটি কক্ষে নিট চারটি করে আসন বাড়াতে হবে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হিসাব অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের আসন ২১৮টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি। অন্যদিকে, সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ৫৩টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ৪৭টি। ফলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল ট্রাম্পের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

কানসাসের উইচিটা শহরের কাছে পার্ক সিটিতে অনুষ্ঠিত সমাবেশে যোগ দিতে অনেককে আন্তঃরাজ্য মহাসড়ক ১৩৫ পেরিয়ে এক মাইলেরও বেশি পথ হেঁটে যেতে হয়। সমাবেশস্থলের কাছে একটি জ্বালানি সরবরাহকেন্দ্রের সাইনবোর্ডে পেট্রল ও ডিজেলের দামও প্রদর্শন করা হচ্ছিল। সেখানে প্রতি গ্যালন পেট্রলের দাম ছিল ৩ ডলার ৯৮ সেন্ট এবং ডিজেলের দাম ৫ ডলার ৭৮ সেন্ট।

ভ্রমণবিষয়ক সংস্থা এএএর তথ্য অনুযায়ী, আগের বছরের তুলনায় কানসাসে প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় দাম প্রায় ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। মূল্যবৃদ্ধির এই চাপ ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সমর্থকদের মধ্যেও অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কানসাসের হাচিনসন এলাকার ৫৯ বছর বয়সী রিপাবলিকান ভোটার মনিক মুলেন প্রতিবন্ধী ভাতা পান এবং তার বাবার দেখাশোনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিবন্ধী ভাতা পাই। আমার হাতে খুব বেশি টাকা নেই। কিন্তু মনে হচ্ছে, জিনিসপত্রের দাম এখনো বাড়ছে। এসব দাম কমানো দরকার। খাবার জোগাড় করতে এখন মনে হয় যেন খুঁজে খুঁজে শিকার করতে হচ্ছে।’

সমাবেশস্থলের কাছে অল্প কয়েকজন বিক্ষোভকারীও জড়ো হন। তাদের একজন কানসাসের হালস্টেড এলাকার বাসিন্দা জেমস নাইটিঙ্গেল। নিজেকে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ হিসেবে পরিচয় দেওয়া নাইটিঙ্গেল অভিযোগ করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির কারণে তার এলাকার কৃষি অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি কানসাসের একজন কৃষক। ট্রাম্প প্রশাসন আমার এলাকার কৃষি অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। তার শুল্কনীতির কারণে শস্য বিক্রির বাজার শুধু ধ্বংসই হয়নি, এখন তিনি দেশের বাইরে থেকে আমদানি করা গরুর মাংসও নিয়ে আসছেন। “সবার আগে আমেরিকা” নীতির কী হলো?’

কানসাসে দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার নজিরও রয়েছে। রাজ্যটির ভোটাররা টানা দুই মেয়াদে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী লরা কেলিকে গভর্নর নির্বাচিত করেছেন। টোয়ান্ডা এলাকার ট্রাম্প-সমর্থক জিনা সিম্যান বলেন, ‘আমার মনে হয় না, এখানে নির্বাচনে জয়ী হওয়া কখনোই সহজ।’ তার মতে, অতীতে রিপাবলিকান প্রার্থীরা অনেক সময় নিজেদের জনপ্রিয়তাকে নিশ্চিত ধরে নিয়েছেন।

সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির উচ্চমূল্য, ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ এবং অভিবাসন ও সাংস্কৃতিক ইস্যুতে রাজনৈতিক বিভাজন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। কানসাসের মতো রিপাবলিকান-প্রধান রাজ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কতটা কঠিন হয়ে উঠছে, তা নিয়েও দলটির মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক নির্বাচনী বক্তব্য ভোটারদের কতটা প্রভাবিত করতে পারে, তা নির্বাচনের ফলাফলে স্পষ্ট হবে।