সারাবিশ্ব
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের জের, আবারও ১১০ ডলারে উঠল তেলের দাম
আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারে পৌঁছেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকারে ধারাবাহিক হামলা এবং উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি তেলের বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
মঙ্গলবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারে পৌঁছায়। গত তিন থেকে চার দিন ধরেই তেলটির দাম বাড়তির দিকে রয়েছে। এর আগের সপ্তাহেও ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১১০ ডলার ছাড়িয়েছিল। পরে তা কমে ব্যারেলপ্রতি ১০৬ থেকে ১০৭ ডলারের মধ্যে নেমে আসে। মে মাসের পর থেকে তেলের দাম আর এ পর্যায়ে ওঠেনি। গত ১৯ মে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ১১১ দশমিক ২৮ ডলার। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ দশমিক ৮১ ডলারে দাঁড়ায়।
তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজার প্রতিবেদনে একই সময়ে তেলের দামে সামান্য পার্থক্য দেখা গেছে। অন্য একটি প্রতিবেদনে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৯ দশমিক ৬৮ ডলার এবং ডব্লিউটিআইয়ের দাম ৯৮ দশমিক ৫৫ ডলার উল্লেখ করা হয়। বাজারে লেনদেন চলমান থাকায় সময়ভেদে এসব দামের পার্থক্য দেখা দিতে পারে। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তেলের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরির অন্যতম প্রধান কারণ হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা। জ্বালানি বাজারবিষয়ক তথ্যপ্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্যের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, গত দুই সপ্তাহে অন্তত ১৮টি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলার ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ দিয়ে তেল সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
কেপলারের হিসাব অনুযায়ী, পারস্য উপসাগর থেকে দৈনিক তেল সরবরাহের গড় পরিমাণ কমে ৮৫ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে। অথচ এর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে এই পথে প্রতিদিন ২ কোটি ব্যারেলের বেশি তেল সরবরাহ করা হচ্ছিল। চলতি মাসের শুরুর দিকে কেপলার জানিয়েছিল, যুদ্ধ শুরুর আগের পর্যায়ে তেল রপ্তানি ফিরে এসেছে। কিন্তু নতুন করে ট্যাংকারে হামলার ঘটনায় সরবরাহ পরিস্থিতির আবারও অবনতি হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের প্রাপ্যতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করে। পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে এই নৌপথের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ফলে এখানে সংঘাত বা জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং এশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের জ্বালানি বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। ট্যাংকার চলাচলে ঝুঁকি বাড়লে পরিবহন ব্যয় ও বীমা খরচ বৃদ্ধির আশঙ্কাও তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত তেলের দামে প্রভাব ফেলতে পারে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা চলছে। যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। পরে এপ্রিলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হলে বাজারে দাম কমতে শুরু করে। মে মাসে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১১ ডলারের ওপরে থাকলেও জুনের শেষ দিকে তা কমে প্রায় ৭৩ ডলারে নেমে আসে। তবে জুলাই থেকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও বাড়তে শুরু করে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতি তেলের বাজারে কীভাবে প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইএনজির পণ্যবাজার বিশ্লেষকেরা। মঙ্গলবার প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে তাঁরা জানান, অঞ্চলটিতে উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় তেলের দাম শক্ত অবস্থানে রয়েছে। পারস্য উপসাগর থেকে সরবরাহের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে ভালো থাকলেও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির কারণে বাজারে বাড়তি মূল্য যুক্ত হচ্ছে। তাঁদের মতে, তেলের সরবরাহ স্থিতিশীল ও পর্যাপ্ত থাকলে সংঘাতজনিত এই অতিরিক্ত মূল্য ধীরে ধীরে কমে আসতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তেমন কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
এদিকে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর সৌদি আরবে নতুন করে হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। জ্বালানি অবকাঠামোর পাশাপাশি বিমানবন্দর ও সামরিক স্থাপনাও এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সৌদি আরবকে ঘিরে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা আরও বাড়ছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদন ও পরিবহন অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা অব্যাহত থাকলে এবং সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো হামলার ঝুঁকিতে থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ আরও কমে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। বিপরীতে, সংঘাত কমে আসা, নৌপথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়া এবং তেল সরবরাহ স্থিতিশীল হলে দাম কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারে পৌঁছানোর পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে শুধু যুদ্ধই নয়, সরবরাহের অনিশ্চয়তা, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপত্তাঝুঁকি এবং বাজারে ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগও দাম বাড়ার অন্যতম কারণ। পরিস্থিতি কোন দিকে এগোয়, তার ওপর নির্ভর করবে আগামী দিনগুলোতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামের গতিপথ।