সারাবিশ্ব
রাশিয়ার হুমকি মোকাবিলায় ১০ লাখ স্থলমাইন কেনার পরিকল্পনা ফিনল্যান্ডের
রাশিয়ার সম্ভাব্য সামরিক হুমকি ও নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলায় ১০ লাখ অ্যান্টি-পারসোনেল মাইন বা পদাতিকবিরোধী স্থলমাইন কেনার পরিকল্পনা করছে ফিনল্যান্ড। এ জন্য প্রায় ১০ কোটি ইউরো ব্যয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশটি। ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর নিজেদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে এ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা কৌশলের আওতায় রাশিয়ার সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকাতেও এসব মাইন ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিনল্যান্ড প্রায় ১০ লাখ পদাতিকবিরোধী স্থলমাইন সংগ্রহ করতে চায়। এ প্রকল্পে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১১ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার। স্থলমাইন নিষিদ্ধসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি অটোয়া কনভেনশন থেকে ফিনল্যান্ডসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ সরে যাওয়ার পর তাদের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় এ ধরনের অস্ত্রের ব্যবহার নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর ইউরোপের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের সমর্থক দেশগুলোর ওপর হাইব্রিড যুদ্ধ, সাইবার হামলা ও বিভিন্ন ধরনের চাপ সৃষ্টির অভিযোগও রয়েছে। সম্ভাব্য সামরিক উসকানি ও সীমান্ত নিরাপত্তার ঝুঁকি বিবেচনায় ফিনল্যান্ড নিজেদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনে মনোযোগ দিচ্ছে। একই ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া ও পোল্যান্ডও অটোয়া কনভেনশন থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ফিনল্যান্ডের সেনাবাহিনীর কমান্ডের কর্নেল রিকু মিকোনেন দেশটির জাতীয় সংবাদ সংস্থা এসটিটিকে জানিয়েছেন, স্থলমাইন কেনার বিষয়ে সম্ভাব্য সরবরাহকারীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। মাইন সংগ্রহের ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে দেশটির।
ফিনল্যান্ডের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ স্থলমাইন সরবরাহের বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করা হতে পারে। এরপর ২০২৮ সালের মধ্যে উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কর্নেল রিকু মিকোনেনের ভাষ্য, ফিনিশ কোম্পানিগুলো নিজ দেশেই এসব মাইন উৎপাদন করতে পারলে তা বিভিন্ন দিক থেকে সুবিধাজনক হবে। এতে সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করার পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের জন্য বিদেশি উৎসের ওপর নির্ভরশীলতাও কমানো সম্ভব হতে পারে।
মিকোনেন আরও জানিয়েছেন, ফিনল্যান্ডের প্রায় ছয়টি প্রতিষ্ঠান এ ধরনের স্থলমাইন উৎপাদনের সক্ষমতা রাখে। তবে দেশীয় উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও বিদেশ থেকে মাইন কেনার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করা হয়নি। সরবরাহের সক্ষমতা, উৎপাদনের সময়সীমা এবং প্রয়োজনীয় পরিমাণের বিষয়গুলো বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, অ্যান্টি-পারসোনেল মাইন নিষিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে ১৯৯৭ সালে অটোয়া কনভেনশন গৃহীত হয়। ১৯৯৯ সালে কার্যকর হওয়া এ আন্তর্জাতিক চুক্তির লক্ষ্য হলো পদাতিকবিরোধী স্থলমাইনের ব্যবহার, উৎপাদন, মজুত ও হস্তান্তর বন্ধ করা এবং বিদ্যমান মজুত ধ্বংসের মাধ্যমে বেসামরিক মানুষের ঝুঁকি কমানো। এসব মাইন দীর্ঘ সময় মাটিতে সক্রিয় থাকতে পারে এবং যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও সাধারণ মানুষের প্রাণহানি ও অঙ্গহানির কারণ হতে পারে।
ফিনল্যান্ড ২০১২ সালে অটোয়া কনভেনশনে যোগ দিয়েছিল। তবে রাশিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কথা উল্লেখ করে ২০২৫ সালের এপ্রিলে দেশটি চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। নির্ধারিত প্রত্যাহারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে চুক্তির বাধ্যবাধকতা আর দেশটির ওপর কার্যকর নেই।
ফিনল্যান্ডের স্থলমাইন কেনার পরিকল্পনা ইউরোপের পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং রাশিয়াকে ঘিরে বাড়তে থাকা উদ্বেগেরই প্রতিফলন। তবে পরিকল্পিত মাইন সংগ্রহ, উৎপাদন ও মোতায়েনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি দেশটির পরবর্তী প্রতিরক্ষা পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করবে।