সারাবিশ্ব

আর্কটিকে প্রভাব বিস্তারে ইইউর নতুন কৌশল, কমাতে চায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:২৬ পিএম

আর্কটিকে প্রভাব বিস্তারে ইইউর নতুন কৌশল, কমাতে চায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা
ছবি: সংগৃহীত

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আর্কটিক অঞ্চলে নিজেদের উপস্থিতি ও প্রভাব বাড়াতে নতুন কৌশল গ্রহণ করতে যাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান তৎপরতা এবং অঞ্চলটির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এ উদ্যোগ নিচ্ছে ২৭ দেশের জোটটি। গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল সংগ্রহ, বরফভাঙা জাহাজের সক্ষমতা বৃদ্ধি, সমুদ্রের তলদেশে যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার করাকে নতুন পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বার্তা সংস্থা এএফপির হাতে আসা ইইউর নতুন ‘আর্কটিক কৌশল’-এর খসড়ায় এসব পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আর্কটিক অঞ্চলে বরফ গলার গতি বাড়ছে। এর ফলে নতুন সমুদ্রপথ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি প্রাকৃতিক সম্পদ ও কৌশলগত অবস্থান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাও তীব্র হচ্ছে। রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী দেশগুলো এ অঞ্চলে নিজেদের তৎপরতা বাড়ানোয় ইউরোপীয় ইউনিয়নও সেখানে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চায়।

ইইউর আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ববিষয়ক প্রধান জোজেফ সিকেলা বলেন, আর্কটিক অঞ্চলের পরিবর্তিত বাস্তবতায় ইউরোপকে শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। নতুন কৌশলের মূল উদ্দেশ্যও সেটি। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্রতা বৃদ্ধি, নিরাপত্তাঝুঁকি এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাসহ অঞ্চলটির গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলো নতুন পরিকল্পনায় তুলে ধরা হয়েছে। এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইউরোপের করণীয়ও এতে নির্ধারণ করা হয়েছে।

আর্কটিক অঞ্চলকে ঘিরে প্রতিযোগিতা বাড়ার অন্যতম কারণ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রের বরফ গলে যাওয়ায় এ অঞ্চলে নতুন নৌপথ ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে তেল, গ্যাস, খনিজসহ মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের সুযোগও বাড়ছে। ফলে অঞ্চলটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং সামরিক ও অর্থনৈতিক উপস্থিতি জোরদার করতে বিভিন্ন দেশের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হয়ে উঠেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭ সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড ও সুইডেন আর্কটিক অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট। বিশেষ করে ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত অবস্থান ইউরোপের নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে আর্কটিক অঞ্চলে যেকোনো বড় ধরনের রাজনৈতিক বা সামরিক পরিবর্তন ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্বার্থে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থানে ইউরোপের উদ্বেগ

গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বারবার দেওয়া বক্তব্য ইউরোপের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা গ্রিনল্যান্ড সামরিক নিরাপত্তা, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের দিক থেকে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এ পরিস্থিতিতে অঞ্চলটিতে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে ইউরোপীয় দেশগুলো আরও সমন্বিত অবস্থান নিতে চাইছে।

আর্কটিক অঞ্চলে সংঘটিত ঘটনাগুলোর প্রভাব শুধু উত্তর মেরু এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং ইউরোপের অন্যান্য অংশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও যোগাযোগব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়ে। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন নতুন কৌশলটি উপস্থাপন করবেন। এর মাধ্যমে আর্কটিক বিষয়ে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি অভিন্ন নীতিগত অবস্থান গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।

এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের ঘনিষ্ঠ অংশীদার কানাডা, যুক্তরাজ্য ও নরওয়ের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে খসড়ায়। আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা, যোগাযোগ, অবকাঠামো এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এসব দেশের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলীয় অংশীদারদের নিয়ে নিয়মিত শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তাবও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

আর্কটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে নতুন হিসাব

দীর্ঘদিন ধরে আর্কটিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হলেও নতুন কৌশলের খসড়ায় দেশটির ভূমিকা তুলনামূলকভাবে সীমিতভাবে উঠে এসেছে। ২০ পৃষ্ঠার নথিতে যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করা হয়েছে মাত্র কয়েকবার। অন্যদিকে, কানাডার নাম এসেছে প্রায় দুই ডজনবার। এ পার্থক্যকে আর্কটিক বিষয়ে ইউরোপের অংশীদারত্ব ও কৌশলগত অগ্রাধিকারে পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বছরের শুরুতে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের কঠোর বক্তব্য ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে উদ্বেগ তৈরি করেছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁর বক্তব্যের সুর কিছুটা নরম হয়েছে এবং গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের সঙ্গে একটি নিরাপত্তা চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অগ্রগতির পরও ইউরোপের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সতর্কতা রয়ে গেছে। ফলে আর্কটিক অঞ্চলে যোগাযোগ ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে সাবমেরিন কেবল স্থাপনের পরিকল্পনা

নতুন কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মূল ভূখণ্ডের সংযোগ স্থাপনে একটি ‘সার্বভৌম ও নিরাপদ’ সাবমেরিন যোগাযোগ কেবল নির্মাণের পরিকল্পনা। সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে স্থাপন করা এ কেবল ইউরোপের যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও নিরাপদ করতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

খসড়ায় বলা হয়েছে, বৃহত্তর ‘প্যান-আর্কটিক’ কেবল প্রকল্পের অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে কানাডা, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকেও সংযুক্ত করার সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আর্কটিক অঞ্চলে নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক তথ্য আদান-প্রদানের বিকল্প পথ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এ ছাড়া আর্কটিক অঞ্চলে স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারণের জন্য ‘আইরিস’ নামের একটি স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক প্রকল্প নিয়েও কাজ করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এর মাধ্যমে দুর্গম উত্তরাঞ্চলে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে। একই সঙ্গে ইলন মাস্কের স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে ইউরোপের নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তোলার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

রাশিয়ার হুমকি মোকাবিলায় নিরাপত্তা জোরদার

আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান সামরিক ও কৌশলগত তৎপরতা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খসড়ায় ড্রোনের অনুপ্রবেশ, সমুদ্রের তলদেশে স্থাপিত যোগাযোগ কেবলে নাশকতা এবং প্রচলিত সামরিক সংঘাতের বাইরে পরিচালিত বিভিন্ন ধরনের হুমকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় নজরদারি, তথ্য আদান-প্রদান ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে রাশিয়ার তেল পরিবহনে ব্যবহৃত কথিত ‘ছায়া নৌবহর’-এর গতিবিধি পর্যবেক্ষণে সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব জাহাজের কার্যক্রম শনাক্ত করতে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় জোরদার করার কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং সম্ভাব্য নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করবে জোটটি।

সব মিলিয়ে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন আর্কটিক কৌশল শুধু একটি আঞ্চলিক পরিকল্পনা নয়; বরং পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় ইউরোপের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা জোরদার করার বৃহত্তর উদ্যোগ। রাশিয়ার তৎপরতা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অনিশ্চয়তা এবং প্রাকৃতিক সম্পদকে ঘিরে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে আর্কটিকে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করাই এখন জোটটির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।