সারাবিশ্ব

ইউরোপজুড়ে কমছে বন্য মৌমাছি, পরাগায়ন সংকটে বড় পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪৫ পিএম

ইউরোপজুড়ে কমছে বন্য মৌমাছি, পরাগায়ন সংকটে বড় পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা
ছবি: সংগৃহীত

ইউরোপজুড়ে বন্য মৌমাছি ও হোভার ফ্লাইয়ের অধিকাংশ প্রজাতির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে। দীর্ঘ এক শতকের তথ্য বিশ্লেষণ করে পরিচালিত এক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উঠে এসেছে এ উদ্বেগজনক চিত্র। গবেষকদের আশঙ্কা, পরাগায়নকারী এসব পতঙ্গের সংখ্যা কমতে থাকলে ইউরোপের জীববৈচিত্র্য, খাদ্য উৎপাদন ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র মারাত্মক সংকটের মুখে পড়তে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা।

আর্মেনিয়ায় জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য সম্মেলন কপ১৭ (COP17) শুরু হওয়ার প্রেক্ষাপটে গবেষণাটির তথ্য সামনে এসেছে। গবেষণার ফলাফল নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের লেখক দ্য গার্ডিয়ানের ইউরোপবিষয়ক পরিবেশ প্রতিনিধি অজিত নিরঞ্জন। গবেষণায় ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে গত এক শতকে মৌমাছি ও হোভার ফ্লাইয়ের উপস্থিতির পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, আল্পস অঞ্চল ছাড়া ইউরোপের প্রায় সব অঞ্চলে নতুন প্রজাতির আবির্ভাব বা সংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় প্রজাতির উপস্থিতি কমে যাওয়ার প্রবণতা বেশি।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপের আটলান্টিক ও কন্টিনেন্টাল জলবায়ু অঞ্চলে মৌমাছি ও হোভার ফ্লাইয়ের প্রজাতিগত সমৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়েছে। অন্য কিছু অঞ্চলে পরিস্থিতি তুলনামূলক মিশ্র হলেও সামগ্রিক চিত্র বিজ্ঞানীদের উদ্বিগ্ন করছে। মহাদেশজুড়ে এসব পরাগায়নকারী পতঙ্গের প্রায় ৮৮ শতাংশ প্রজাতিকে অন্তর্ভুক্ত করে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবেশের প্রতি সংবেদনশীল প্রজাতিগুলো ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। বিপরীতে, পরিবেশগত পরিবর্তন সহ্য করতে সক্ষম অল্প কয়েকটি প্রজাতি তুলনামূলকভাবে টিকে থাকছে। ফলে পরাগায়নকারী পতঙ্গের সামগ্রিক বৈচিত্র্য ও প্রজাতিগত ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে।

গবেষকদের মতে, কোনো অঞ্চলে কয়েকটি প্রজাতির উপস্থিতি বজায় থাকলেই সেখানকার জীববৈচিত্র্য সুস্থ রয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায় না। কারণ, কিছু সহনশীল প্রজাতির আধিপত্যের আড়ালে বহু সংবেদনশীল প্রজাতির সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টি ঢাকা পড়ে যেতে পারে। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে উদ্ভিদের পরাগায়ন, বংশবিস্তার এবং খাদ্যশৃঙ্খলসহ বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রাকৃতিক পরিবেশ ও খাদ্য উৎপাদনে পরাগায়নকারী পতঙ্গের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বজুড়ে বন্য সপুষ্পক উদ্ভিদের প্রায় ৯০ শতাংশ এবং প্রধান খাদ্যশস্যের তিন-চতুর্থাংশের বেশি প্রাণীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পরাগায়নের ওপর নির্ভরশীল। মৌমাছি ও হোভার ফ্লাই ফুলের পরাগ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরের মাধ্যমে উদ্ভিদের প্রজননে সহায়তা করে। এসব পতঙ্গের সংখ্যা কমে গেলে অনেক উদ্ভিদের বংশবিস্তার ব্যাহত হতে পারে, যা দীর্ঘ মেয়াদে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থাও (এফএও) বিভিন্ন সময়ে পরাগায়নকারী প্রাণীর হ্রাস নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরাগায়নকারীদের সংখ্যা কমে যাওয়ার ফলে শুধু উদ্ভিদ ও খাদ্য উৎপাদনই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বরং বাস্তুতন্ত্রের জলবায়ু পরিবর্তন ও অন্যান্য পরিবেশগত চাপ মোকাবিলার ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়বে। এর ফলে বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও খাদ্যের প্রাপ্যতা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে।

গবেষণাপত্রটির প্রধান লেখক এবং স্প্যানিশ ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিলের পরিবেশবিদ কার্লোস মার্তিনেজ-নুনেজের মতে, গবেষণার ফলাফল জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে। বাইরে থেকে কোনো অঞ্চলের প্রজাতিগত বৈচিত্র্য স্থিতিশীল মনে হলেও তার আড়ালে উল্লেখযোগ্য ক্ষয় চলতে পারে। তবে এ ধরনের পরিবর্তনের তথ্য এখন সামনে আসায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তিনি আরও সতর্ক করেছেন, বর্তমানে যেসব প্রজাতির সংখ্যা বাড়ছে বা যারা পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে টিকে থাকতে পারছে, ভবিষ্যতেও তারা একইভাবে টিকে থাকবে-এমন নিশ্চয়তা নেই। জলবায়ু পরিবর্তন, আবাসস্থল ধ্বংস এবং পরিবেশগত চাপ বাড়তে থাকলে বর্তমানে তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা প্রজাতিগুলোও সংকটে পড়তে পারে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, গত শতকে নথিভুক্ত প্রজাতিগুলোর প্রায় ৯১ শতাংশকে ২০০১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে অন্তত একবার পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এই তথ্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, ইউরোপে প্রায় ৯ শতাংশ প্রজাতি দীর্ঘ সময় ধরে আর শনাক্ত হয়নি এবং সেগুলোর কিছু ইতিমধ্যে আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত হয়ে থাকতে পারে। তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, কোনো প্রজাতিকে সাম্প্রতিক সময়ে দেখা না যাওয়াই তার সম্পূর্ণ বিলুপ্তির চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। যেসব প্রজাতি শনাক্ত করা যায়নি, ঐতিহাসিক নথিতেও তাদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বিরল ছিল। তাই এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও তথ্য ও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

গবেষণাটির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকা বাস্ক সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জের পরিবেশবিষয়ক গবেষক আইনহোয়া মাত্রাগ বলেন, নতুন গবেষণার ফলাফল দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের মধ্যে থাকা উদ্বেগকে আরও জোরালো করেছে। অনেক পরাগায়নকারী প্রজাতি তাদের আবাসস্থল হারাচ্ছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। তবে এ পতনের প্রভাব সব প্রজাতি বা অঞ্চলে সমানভাবে পড়ছে না।

তিনি উল্লেখ করেন, এর আগে পরাগায়নকারী পতঙ্গের সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়ে অধিকাংশ তথ্য পাওয়া গিয়েছিল যুক্তরাজ্য, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসের মতো উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের কয়েকটি দেশ থেকে। নতুন গবেষণায় মহাদেশের বিস্তৃত অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সমস্যাটির ব্যাপকতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। যদিও অঞ্চলভেদে পরিস্থিতির পার্থক্য রয়েছে, তবু এ সংকটকে শুধু কয়েকটি দেশের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্য মৌমাছি ও হোভার ফ্লাইয়ের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস, কৃষিজমিতে কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার, পরিবেশদূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভূমির ব্যবহার পরিবর্তনের কারণে এসব পতঙ্গের খাদ্য ও প্রজননের উপযুক্ত পরিবেশ সংকুচিত হচ্ছে। ফুলসমৃদ্ধ তৃণভূমি ও প্রাকৃতিক উদ্ভিদ আচ্ছাদন কমে যাওয়ায় অনেক প্রজাতির বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিশ্বজুড়েই মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর চাপ বাড়ছে। বন উজাড়, নগরায়ণ, নিবিড় কৃষিকাজ এবং বিভিন্ন ধরনের দূষণের ফলে অসংখ্য বন্যপ্রাণী আবাসস্থল হারাচ্ছে। এর প্রভাব শুধু প্রকৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; খাদ্যব্যবস্থার স্থিতিশীলতা, কৃষি উৎপাদন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলার সক্ষমতার ওপরও পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, জীববৈচিত্র্যের এই অবক্ষয় নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে পরিবেশগত সংকট আরও তীব্র হতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ১৯৯২ সালে রিও ডি জেনিরোতে জীববৈচিত্র্য সনদ গৃহীত হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও সেগুলোর বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়ে গেছে বলে পরিবেশসংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ রয়েছে।

চলতি দশকের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণসংক্রান্ত লক্ষ্যগুলোর অগ্রগতি মূল্যায়ন কপ১৭ সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। এসব লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীর অন্তত ৩০ শতাংশ স্থলভাগ ও সামুদ্রিক অঞ্চল সংরক্ষণের আওতায় আনা, পরিবেশের ক্ষতি করে এমন ভর্তুকি বছরে অন্তত ৫০০ বিলিয়ন ডলার কমানো বা সংস্কার করা এবং বিশ্বের ৩০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা।

বিজ্ঞানীদের মতে, পরাগায়নকারী পতঙ্গের সংকট মোকাবিলায় প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা, কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, ফুলসমৃদ্ধ উদ্ভিদ ও তৃণভূমি সংরক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নে সরকারগুলোর কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ইউরোপের বন্য মৌমাছি ও অন্যান্য পরাগায়নকারী পতঙ্গের পতন ভবিষ্যতে আরও বড় পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে।