সারাবিশ্ব

মোদির বাসভবনের পাশে ঐতিহাসিক মসজিদ খালি করার নির্দেশ, ৬ দিনের সময়সীমা


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৭ পিএম

মোদির বাসভবনের পাশে ঐতিহাসিক মসজিদ খালি করার নির্দেশ, ৬ দিনের সময়সীমা
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের পাশে অবস্থিত ঐতিহাসিক রেসকোর্স মসজিদ খালি করার নির্দেশ দিয়েছে দেশটির ল্যান্ড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (এলঅ্যান্ডডিও)। মসজিদটিকে অনুমোদনহীন স্থাপনা হিসেবে উল্লেখ করে ছয় দিনের মধ্যে ভবনটি খালি করার নির্দেশ দিয়ে নোটিশ জারি করা হয়েছে। সোমবার (১৯ অক্টোবর) এ নোটিশ জারি করা হয় বলে বিভিন্ন ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ট্রিবিউন-এর বরাতে দ্য ওয়্যার জানিয়েছে, নয়াদিল্লির ৭, লোক কল্যাণ মার্গে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের কাছেই রেসকোর্স মসজিদটির অবস্থান। মসজিদটি নয়াদিল্লি মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিলের (এনডিএমসি) ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে মসজিদটির জমির মালিকানা ও স্থাপনার বৈধতা নিয়ে বর্তমানে প্রশ্ন উঠেছে। এলঅ্যান্ডডিওর দাবি, মসজিদটি সরকারি জমিতে নির্মিত হয়েছে। এদিকে, স্থাপনাটির ঐতিহ্যবাহী তালিকায় অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

এরই মধ্যে গত ৭ অক্টোবর থেকে মসজিদটির বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে মুসল্লিদের নামাজ আদায়, মসজিদে যাতায়াত এবং দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে পানি সরবরাহ বন্ধ থাকায় মসজিদটির স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

ঐতিহাসিক মসজিদ ও এর পাশের কবরস্থান রক্ষায় ভারতের কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজুর জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ। এ বিষয়ে সংগঠনটির একটি প্রতিনিধি দল মন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়েছে। প্রতিনিধি দলের সদস্য মোহাম্মদ হাকিমুদ্দিন কাসমি জানিয়েছেন, ১৯৭৭ সালের দিল্লি গেজেট এবং সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার তালিকা-উভয় নথিতেই মসজিদটির উল্লেখ রয়েছে। এ কারণে স্থাপনাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মসজিদটির জমি ও স্থাপনার বৈধতা নিয়ে চলমান আইনি বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের উচ্ছেদ বা ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়। সংগঠনটি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে দিল্লি ওয়াকফ বোর্ড ও এনডিএমসির কাছে এ বিষয়ে প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। দ্য ট্রিবিউন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।

অন্যদিকে, মসজিদটির ইমাম মোহাম্মদ হারুন দিল্লি ওয়াকফ বোর্ডের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। দ্য হিন্দুস্তান গেজেট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক ভিডিও বার্তায় তিনি অভিযোগ করেন, গত ছয় মাস ধরে ওয়াকফ বোর্ডের কাছে বারবার আবেদন জানিয়েও কার্যকর কোনো সহায়তা পাননি। তাঁর দাবি, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘটনায় এনডিএমসিকে একটি চিঠি দেওয়া ছাড়া বোর্ডের পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

ইমাম মোহাম্মদ হারুন আরও জানান, মসজিদে প্রবেশের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেখানে খাবার পানিও নিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি ওয়াকফ বোর্ডকে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। এমনকি নিজে মামলা করার অনুমতি চাইলেও বোর্ড তাঁকে সেই অনুমতি দেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা না পাওয়ায় ঐতিহাসিক মসজিদটি রক্ষার বিষয়ে তিনি অসহায় বোধ করছেন। এ অবস্থায় মসজিদটি রক্ষায় সাধারণ মানুষের সহযোগিতাও কামনা করেছেন তিনি।

ইমামের দাবি, ২০২১ সালে পরিচালিত একটি সরকারি জরিপেও মসজিদটিকে অনুমোদনহীন স্থাপনা বা জবরদখল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। তবে তাঁর এই বক্তব্যসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বিভিন্ন অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে মসজিদটির জমির মালিকানা, নির্মাণের বৈধতা এবং ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবে এর স্বীকৃতির বিষয়গুলো নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এদিকে, মসজিদ খালি করার নোটিশকে রেসকোর্স রোড ও এর আশপাশের এলাকায় চলমান উচ্ছেদ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দ্য হিন্দুস্তান গেজেট-এর তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা ও এলাকার সৌন্দর্যবর্ধনের স্বার্থে ওই এলাকার বস্তিবাসীদের উচ্ছেদের বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে দিল্লি হাইকোর্ট। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, সেখানকার বাসিন্দাদের প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে সাভদা ঘেভরা পুনর্বাসন কলোনিতে স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।

পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে বাসিন্দাদের শিক্ষা, পরিবহণ ও পয়োনিষ্কাশন সুবিধা নিশ্চিত করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বস্তি উচ্ছেদ এবং ঐতিহাসিক রেসকোর্স মসজিদ খালি করার নির্দেশ একই এলাকার বৃহত্তর কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও, মসজিদটির বিষয়ে আইনি বিরোধ ও ঐতিহাসিক স্বীকৃতির প্রশ্ন আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

মোদির সরকারি বাসভবনের কাছাকাছি অবস্থিত এই মসজিদকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে সরকারি জমিতে স্থাপনা নির্মাণের বৈধতা নিয়ে কর্তৃপক্ষের প্রশ্ন, অন্যদিকে ঐতিহাসিক স্বীকৃতি ও ধর্মীয় স্থাপনা রক্ষার দাবি-দুইয়ের মধ্যে আইনি নিষ্পত্তি এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মসজিদটি খালি করার নির্দেশ বাস্তবায়িত হবে কি না, নাকি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত আসবে, তা এখন দেখার বিষয়।