সারাবিশ্ব
এআইয়ের তৈরি ভুয়া ভালুকের ছবি, আতঙ্কে তল্লাশি; রুশ নারীকে জরিমানা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ভালুকের একটি ভুয়া ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মেসেজিং অ্যাপে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় রাশিয়ার এক নারীকে জরিমানা করেছেন আদালত। বন্ধুকে বোকা বানানোর উদ্দেশ্যে তৈরি করা ছবিটি ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ ও বন্য প্রাণী নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত কর্মীদের ওই এলাকায় তল্লাশি চালাতে হয়। পরে ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি বলে স্বীকার করেন ওই নারী। এ ঘটনায় তাঁকে ১৫ হাজার রুবল জরিমানা করা হয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটেছে রাশিয়ার সুদূর পূর্বাঞ্চলের আমুর অঞ্চলের মাগদাগাচি এলাকায়। গত সেপ্টেম্বরে ওই নারী চ্যাটজিপিটির সহায়তায় একটি বড় বাদামি ভালুকের ছবি তৈরি করেন। ছবিতে মনে হচ্ছিল, একটি বিশাল ভালুক স্থানীয় সড়কে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মূলত বন্ধুর সঙ্গে মজা করার উদ্দেশ্যে তিনি ছবিটি তৈরি করে পাঠিয়েছিলেন। তবে ছবিটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় তাঁর সেই কৌতুক শেষ পর্যন্ত জনমনে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আমুর অঞ্চলের আদালতের প্রেস সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ছবিটি বিভিন্ন মেসেজিং অ্যাপে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কিত হয়ে পুলিশকে ফোন করতে থাকেন। এলাকায় সত্যিই কোনো ভালুক ঘুরে বেড়াচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত হতে পুলিশ ও বন্য প্রাণী উদ্ধার ও নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত কর্মীদের পাঠানো হয়। পরে ওই নারী নিজেই পুলিশের কাছে গিয়ে ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি করার কথা স্বীকার করেন। এরপর আদালত তাঁকে ১৫ হাজার রুবল জরিমানা করেন, যা প্রায় ১৭৮ মার্কিন ডলারের সমান।
রাশিয়ায় এ ধরনের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় ট্রান্সবাইকাল এলাকায় একই ধরনের ভুয়া ছবি প্রকাশের ঘটনায় আরেক নারীকে ৩০ হাজার রুবল জরিমানা করা হয়েছিল। পরপর এমন ঘটনায় এআই দিয়ে তৈরি বিভ্রান্তিকর ছবি জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সময় ও সম্পদ ব্যয়ের কারণ হয়ে উঠছে।
রাশিয়ায় ভালুকের ভুয়া ছবি নিয়ে মানুষের উদ্বেগের পেছনে বাস্তব পরিস্থিতিও রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে রুশ সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানানো হয়েছে, চলতি বছরের বসন্তের পর থেকে ভালুকের আক্রমণে দেশটিতে অন্তত ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। ফলে লোকালয়ে ভালুকের উপস্থিতি নিয়ে মানুষের মধ্যে আগে থেকেই উদ্বেগ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ভালুকের ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে তা সত্যি বলে বিশ্বাস করার প্রবণতাও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভালুকের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বেরি ও পাইন বাদামের মতো প্রাকৃতিক খাদ্যের ঘাটতির কারণে এসব প্রাণী খাবারের সন্ধানে মানুষের বসতিতে চলে আসছে। বিশেষ করে শীতনিদ্রা থেকে জেগে ওঠার পর খাবারের খোঁজে তারা লোকালয়ের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করে। গত তিন দশকে রাশিয়ায় বাদামি ভালুকের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে প্রায় ৩ লাখ ৮ হাজারে পৌঁছেছে। তুলনামূলক উষ্ণ ও সংক্ষিপ্ত শীতকালও এই সংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে, মানুষের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে-এমন ভালুক নিয়ন্ত্রণে রুশ কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। রুশ রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসের ১০ অক্টোবর প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে মানুষের জন্য বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচিত ৩ হাজার ৪৪০টিরও বেশি ভালুক হত্যা করা হয়েছে। তবে বন্য প্রাণীর আক্রমণ মোকাবিলার পাশাপাশি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রাণীদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ও খাদ্যসংকটের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় এ ঘটনাটি এআই দিয়ে তৈরি ছবি ও ভিডিওর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বাস্তবের মতো দেখতে ছবি তৈরি করা সহজ হওয়ায় সেগুলো দেখে সত্য-মিথ্যা আলাদা করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো ছবি যাচাই না করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে তা থেকে অযথা আতঙ্ক সৃষ্টি হতে পারে এবং প্রশাসনকে জরুরি কাজে ব্যস্ত হতে হয়।
রাশিয়ার এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ছবি বা ভিডিও দেখেই সেটিকে সত্য বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে জননিরাপত্তা, বন্য প্রাণীর আক্রমণ কিংবা জরুরি পরিস্থিতিসংক্রান্ত কোনো তথ্য প্রচারের আগে তার সত্যতা যাচাই করা জরুরি। এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি দায়িত্বশীলভাবে ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি ও শেয়ার করাও এখন সময়ের দাবি।