সারাবিশ্ব
পরিবেশবিরোধী অপরাধে প্রযুক্তির অপব্যবহার, হুমকিতে আদিবাসীদের জীবন-জীবিকা
লাতিন আমেরিকায় অবৈধ খনন, বন উজাড় ও অন্যান্য পরিবেশবিরোধী অপরাধে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট, ড্রোন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার বাড়ছে। এসব প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে অপরাধী চক্র প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা ও সম্প্রসারণ করছে। এর ফলে বিশেষ করে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার, জীবিকা, নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষা নতুন করে হুমকির মুখে পড়ছে। প্রযুক্তির এমন অপব্যবহার ঠেকাতে সরকার এবং প্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে আন্তঃআমেরিকান মানবাধিকার কমিশনের একটি বিশেষ দপ্তর।
অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত অধিকারবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদকের দপ্তর রেডেস্কা (REDESCA) এ আহ্বান জানিয়েছে। দপ্তরটি সতর্ক করে বলেছে, প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ও অপরাধমূলক ব্যবহার বনাঞ্চল এবং প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে আদিবাসী সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যগত ভূমি, প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল জীবনযাপন এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
রেডেস্কার তথ্য অনুযায়ী, প্রচলিত যোগাযোগব্যবস্থা নেই-এমন দুর্গম এলাকাতেও অবৈধ খনন কার্যক্রম পরিচালনায় স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবহার করা হচ্ছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে অপরাধী চক্র নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ, বিভিন্ন কার্যক্রমের সমন্বয়, অর্থ লেনদেন এবং লোকজনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে। এ ক্ষেত্রে ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংকের মতো প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দপ্তরটি। প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্রুত যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হলেও অপরাধী গোষ্ঠীগুলো একই সুবিধা কাজে লাগাতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
অন্যদিকে, অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়-এমন এলাকায় নজরদারি বাড়ানো এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য সশস্ত্র গোষ্ঠী ও অপরাধী সংগঠনগুলো ড্রোন ব্যবহার করছে। এসব ড্রোনের মাধ্যমে দূর থেকে কোনো এলাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা এবং স্থানীয় মানুষের চলাচলের ওপর নজর রাখা সম্ভব হচ্ছে। ফলে অপরাধী চক্রের পক্ষে দুর্গম এলাকায় কার্যক্রম পরিচালনা ও বিস্তৃত করা সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভীতি সৃষ্টি এবং তাদের ওপর চাপ প্রয়োগের ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রজেক্টের (এসিএলইডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকে লাতিন আমেরিকায় সশস্ত্র ড্রোন-সংশ্লিষ্ট প্রায় ৬৭০টি ঘটনার নথি পাওয়া গেছে। সংস্থাটির আগস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ঘটনার ৭২ শতাংশের বেশি ঘটেছে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্টের মধ্যে। তবে এই পরিসংখ্যানের সব ঘটনা পরিবেশবিরোধী অপরাধের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়। বরং অঞ্চলটিতে সশস্ত্র ড্রোনের ব্যবহার ও বিস্তারের প্রবণতা বোঝাতে এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবেশবিরোধী অপরাধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে রেডেস্কা। বিশেষ করে অবৈধ সোনার খনিতে ব্যবহৃত বিষাক্ত ধাতু পারদ বিক্রির প্রচারে টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের বিষয়টি সামনে এসেছে। দপ্তরটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অবৈধ সোনার খনিতে ব্যবহারের জন্য পারদ বিক্রির বিজ্ঞাপন বা প্রচারসংবলিত টিকটকের ১০৮টি পোস্টের সন্ধান পেয়েছেন সরকারি কৌঁসুলিরা। পোস্টগুলো সম্মিলিতভাবে ৫৮ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে। তবে কোন দেশের তদন্তে এসব পোস্ট শনাক্ত করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি দপ্তরটি।
পারদ পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। অবৈধ সোনার খনিতে সোনা পৃথক করার কাজে এটি ব্যবহার করা হয়। ব্যবহারের পর পারদ নদী, জলাশয় ও মাটিতে মিশে পরিবেশ দূষিত করতে পারে। দূষিত পানিতে থাকা মাছের মাধ্যমে এই বিষাক্ত পদার্থ খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে মানুষের শরীরেও পৌঁছাতে পারে। এর ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি জীবনযাত্রা ঝুঁকির মুখে পড়ে। বিশেষ করে যেসব আদিবাসী সম্প্রদায় মাছ ধরা, কৃষিকাজ ও বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল, তাদের ওপর এ ধরনের দূষণের প্রভাব মারাত্মক হতে পারে।
তবে প্রযুক্তি যে কেবল অপরাধী চক্রের হাতিয়ার, বিষয়টি এমন নয়। যথাযথভাবে ব্যবহার করা হলে স্যাটেলাইট চিত্র, জিপিএস, ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা (জিআইএস) এবং ড্রোন পরিবেশ সংরক্ষণ ও আদিবাসীদের ভূমির অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এসব প্রযুক্তির সাহায্যে বন উজাড়, অবৈধ খনন, ভূমি দখল এবং নিজেদের ঐতিহ্যগত এলাকায় অনুপ্রবেশ শনাক্ত করা সম্ভব। পাশাপাশি ছবি, অবস্থান ও অন্যান্য তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে অপরাধের প্রমাণ সংরক্ষণ করা যায়। এতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সরাসরি উপস্থিত না হয়েও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানোর সুযোগ তৈরি হয়।
প্রযুক্তির অপব্যবহার ঠেকাতে রেডেস্কা সরকারগুলোর প্রতি প্রযুক্তি হস্তান্তর ও ব্যবহারের ওপর নজরদারি জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে পরিবেশবিরোধী অপরাধে প্রযুক্তির ব্যবহার কীভাবে ঘটছে, তা তদন্ত করা এবং অপরাধী গোষ্ঠীর হাতে এসব প্রযুক্তি পৌঁছানোর ঝুঁকি মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে দপ্তরটি। প্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তাদের পণ্য এবং সেবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে কীভাবে ব্যবহৃত হতে পারে, তা পর্যালোচনা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রযুক্তির বৈধ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি এর অপব্যবহার প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াও জরুরি বলে মনে করছে সংস্থাটি।
জাতিসংঘের আন্তদেশীয় সংগঠিত অপরাধবিষয়ক সম্মেলন চলাকালে এ আহ্বান জানানো হয়েছে। ভিয়েনায় ১৯ থেকে ২৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সম্মেলনে অবৈধ খনন, বন উজাড় ও বন্য প্রাণী পাচারসহ বিভিন্ন পরিবেশবিরোধী অপরাধ মোকাবিলায় নতুন আন্তর্জাতিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সম্মেলনে আমাজন অঞ্চলের এক ডজনের বেশি আদিবাসী প্রতিনিধি অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে সমন্বিত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন। তাদের মতে, পরিবেশবিরোধী অপরাধের প্রভাব কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু, জনস্বাস্থ্য এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকারও জড়িত।
এদিকে, রেডেস্কা প্রযুক্তির উৎপাদন ও পরিচালনার পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও সতর্ক করেছে। উন্নত প্রযুক্তির অবকাঠামো পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও পানির প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি প্রযুক্তিপণ্যে ব্যবহৃত বিভিন্ন খনিজের উত্তোলন এবং ব্যবহারের পর ইলেকট্রনিক বর্জ্য তৈরি পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে প্রযুক্তির সুফল কাজে লাগানোর পাশাপাশি এর অপব্যবহার, পরিবেশদূষণ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি কমাতে কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
সামগ্রিকভাবে, লাতিন আমেরিকায় পরিবেশবিরোধী অপরাধ মোকাবিলায় প্রযুক্তির ব্যবহার এখন দ্বিমুখী বাস্তবতা তৈরি করেছে। একদিকে প্রযুক্তি বন ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় সহায়তা করতে পারে, অন্যদিকে অপরাধী গোষ্ঠীর হাতে একই প্রযুক্তি পরিবেশ ধ্বংস ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার ক্ষুণ্ন করার হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারে জবাবদিহি নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।