সারাবিশ্ব
ইরানের হুঁশিয়ারি: নতুন আগ্রাসন হলে সর্বাত্মক যুদ্ধের জবাব
আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের আশঙ্কার মধ্যে যেকোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসন, হত্যাকাণ্ড কিংবা গুপ্তহত্যার জবাব দিতে সর্বাত্মক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছে ইরান। দেশটির এক ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। বুধবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভিকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
ওই নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, শত্রুপক্ষের যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দেওয়ার বিষয়ে ইরান চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সীমাবদ্ধতা বা সংযম দেখানো হবে না। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। নতুন করে হামলা চালানো হলে আগ্রাসী শক্তি এবং এ অঞ্চলে তাদের সহযোগীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ও ইরানের নাগালের মধ্যে থাকা লক্ষ্যবস্তুতে পূর্ণ শক্তিতে আঘাত হানা হবে।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানো হলে এর পরিণতি শুধু দেশটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং পুরো অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থ, সামরিক অবস্থান এবং তাদের সহযোগীদের লক্ষ্যবস্তু বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। তেহরান মনে করে, সম্ভাব্য যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দিতে প্রয়োজনীয় সামরিক সক্ষমতা ও প্রস্তুতি তাদের রয়েছে।
ওই কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সহযোগিতার বিষয়টিও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, ইসরায়েলকে বাদ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযান চালাবে, কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ ছাড়া ইসরায়েল এককভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়াবে-এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। তিনি এ ধরনের ধারণাকে ‘তিক্ত কৌতুক’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং দুই দেশের সামরিক কার্যক্রমের মধ্যে গভীর সমন্বয়ের বিষয়টি উল্লেখ করেন।
ইরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশটির বিরুদ্ধে হামলার বিষয়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের প্রকাশ্য হুমকি তেহরানকে আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ নেওয়ার আইনি ও নৈতিক ভিত্তি দিয়েছে। ইরানের সামরিক কমান্ডার ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও বারবার সতর্ক করে বলেছেন, দেশটির বিরুদ্ধে নতুন করে আগ্রাসন চালানো হলে তা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য আরও বড় হুমকি তৈরি করতে পারে।
এদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের একমাত্র কারণ নয়। তেহরানের দাবি, দেশটির ইসলামি শাসনব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক প্রতিরোধ সক্ষমতা নিয়েও ওয়াশিংটনের বিরোধিতা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও ইরানের অভিযোগের মধ্যে স্পষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনার বিষয়েও কঠোর অবস্থান নিয়েছে তেহরান। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এসএনএসসি) সচিব মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি মঙ্গলবার বলেছেন, ওয়াশিংটন আস্থা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হবে না। নিজের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু করতে হলে ইরানের উত্থাপিত সব শর্ত পূরণ করতে হবে।
ইরানের সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে শর্তের কথা জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, এ জন্য তেহরানের নির্ধারিত সাতটি শর্ত পূরণ করতে হবে। মঙ্গলবার তেহরানে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে বৈঠকে গালিবাফ বলেন, ভুল হিসাব-নিকাশের কারণে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র এখন গভীর সংকটে পড়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে ওয়াশিংটনকেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের স্বাক্ষরিত ১৪ দফা ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ অনুযায়ী, তেহরান পর্যায়ক্রমে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার কথা জানিয়েছে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা এবং ইরানের ওপর আরোপিত অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের শর্ত দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
পারস্য উপসাগর ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন ধরেই আঞ্চলিক উত্তেজনার অন্যতম কেন্দ্র। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসন শুরুর দিকে মার্চ মাসে তেহরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ নেয়। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যেকোনো অস্থিরতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ, তেলের বাজার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরানের সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। তেহরান একদিকে সম্ভাব্য সামরিক হামলার বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিক্রিয়ার ঘোষণা দিচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতির ক্ষেত্রে নিজেদের শর্ত পূরণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সামরিক পদক্ষেপ, কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং আলোচনার অগ্রগতির ওপর।