সারাবিশ্ব
দুই মাসে মার্কিন ঋণ বাড়ল ৪০০ বিলিয়ন ডলার, অর্থনীতি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ নতুন রেকর্ড গড়ে প্রায় ৪০ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। মাত্র দুই মাসে দেশটির সরকারি ঋণ প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে। ঋণের এই দ্রুত বৃদ্ধি নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরকারি ব্যয়, ক্রমবর্ধমান সুদ পরিশোধের চাপ এবং বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জের কারণে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
রুশ বার্তা সংস্থা তাসের এক বিশ্লেষণে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মোট জাতীয় ঋণের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ৪০ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার। এর আগে চলতি বছরের ১৯ আগস্ট দেশটির সরকারি ঋণ প্রথমবারের মতো ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করে। এরপর মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে ঋণের পরিমাণ আরও প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে, যা মোট ঋণের তুলনায় প্রায় ১ শতাংশ বৃদ্ধি।
বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় ঋণের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সরকারি আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা অব্যাহত থাকলে ঋণের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ঋণের সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি পেলে অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঋণের পাশাপাশি এর সুদ পরিশোধের ব্যয়ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জাতীয় ঋণের সুদ পরিশোধে দেশটিকে বছরে প্রায় ৯৭০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে। এই বিপুল অর্থ সরকারের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় করার সুযোগ সীমিত করতে পারে। ২০২০ সালের পর থেকে ঋণের সুদ বাবদ ব্যয় প্রায় তিন গুণ বেড়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ঋণের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি সুদের হার তুলনামূলক বেশি থাকলে ভবিষ্যতে এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১২০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। জিডিপি হলো একটি নির্দিষ্ট সময়ে কোনো দেশের ভেতরে উৎপাদিত সব চূড়ান্ত পণ্য ও সেবার মোট আর্থিক মূল্য। ঋণ-জিডিপি অনুপাত ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলে তার অর্থ দাঁড়ায়, সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ এক বছরের জাতীয় উৎপাদনের মূল্যের চেয়েও বেশি। তবে এই অনুপাত বেশি হলেই তাৎক্ষণিকভাবে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেবে, এমন নয়; ঋণের সুদ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সরকারের রাজস্ব আয়ের সক্ষমতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের বিশ্লেষণেও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি উঠে এসেছে। সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং করব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার করা না হলে আগামী কয়েক বছরে জাতীয় ঋণ আরও দ্রুত বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে উল্লেখিত পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ছয় বছরের মধ্যে দেশটির মোট জাতীয় ঋণ ৫০ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণের এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাজেট ঘাটতি কমানো, সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ, রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে ঋণের সুদ পরিশোধে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির জন্যই নয়, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সুদের হার এবং বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে মার্কিন অর্থনীতির ব্যাপক প্রভাব থাকায় দেশটির ঋণ পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ গতিপথের দিকে নজর রাখছেন বিনিয়োগকারী ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তবে ঋণ নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের নীতি নেওয়া হবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কতটা বজায় থাকবে, তার ওপরই পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে।