সারাবিশ্ব
ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত রাশিয়ার একাধিক ডেটা সেন্টার, চাপে এআই উন্নয়ন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে রাশিয়া। সার্চ ইঞ্জিন, ই-কমার্স, অনলাইন ব্যাংকিং থেকে শুরু করে বিভিন্ন ডিজিটাল সেবায় দেশটির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে ইউক্রেনের সাম্প্রতিক ড্রোন হামলায় রাশিয়ার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ডেটা সেন্টার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির প্রযুক্তি খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলে দৈনন্দিন অনলাইন সেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রাশিয়ার এআই উন্নয়নের উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনাও বাধার মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি মাসে ইউক্রেনের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে রাশিয়ার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইয়ানডেক্সের তিনটি ডেটা সেন্টার, দেশটির বৃহত্তম ব্যাংক সারব্যাংকের একটি ডেটা সেন্টার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভিকনতাক্তের একটি ডেটা সেন্টার। ভিকনতাক্ত রাশিয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয় একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এসব হামলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি। তবে রাশিয়ার বিভিন্ন ব্যবহারকারী ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্লাউডভিত্তিক সেবা ব্যবহারে সমস্যার কথা জানিয়েছে।
ডেটা সেন্টারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রাশিয়ার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল সেবায় এর প্রভাব পড়েছে। ব্যাংকিং কার্যক্রম, ই-কমার্স, অবস্থান শনাক্তকরণ বা জিওলোকেশন এবং রাইড শেয়ারিংয়ের মতো সেবা পরিচালনায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ইয়ানডেক্সের ভার্চ্যুয়াল সহকারী আলিসা এবং প্রতিষ্ঠানটির মাল্টিমোডাল এআই চ্যাটবটসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর সেবার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এসব সেবা পরিচালনার জন্য বিপুল পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং অবকাঠামোর প্রয়োজন হয়। ফলে ডেটা সেন্টারের ক্ষতি প্রযুক্তি খাতের একাধিক পরিষেবাকে একই সঙ্গে প্রভাবিত করতে পারে।
এই সংকটের প্রভাব পড়েছে রাশিয়ার বিচারিক কার্যক্রমেও। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ডেটাবেসে প্রবেশ করতে না পারায় দেশটির কিছু আরবিট্রেশন কোর্টের কার্যক্রম বাতিল বা স্থগিত করতে হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যবসায়িক বিরোধ নিষ্পত্তি ও বাণিজ্যিক মামলার শুনানিতে ডিজিটাল তথ্যভান্ডারের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এ ধরনের প্রযুক্তিগত বিপর্যয় বিচারপ্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত ডেটা সেন্টারগুলোর অবকাঠামো পুনরুদ্ধার এবং স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনতে কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ইন্টারনেট প্রোটেকশন সোসাইটির প্রধান মিখাইল ক্লিমারেভের মতে, এই হামলার ফলে এআই প্রতিযোগিতায় রাশিয়ার অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে ইউরেশিয়া গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক নিক রেইনার্স মনে করেন, কৌশলগত দিক থেকে ডেটা সেন্টার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু। কারণ, এসব স্থাপনায় আঘাত হানলে একটি দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো এবং বিভিন্ন অনলাইন সেবায় একযোগে প্রভাব পড়তে পারে। তবে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর অবস্থা ও পুনরুদ্ধারের অগ্রগতি সম্পর্কে আরও তথ্য প্রয়োজন।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের ডেটা সংরক্ষণের নীতির পার্থক্যও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেন তাদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের কিছু অংশ মিত্র দেশগুলোর অবকাঠামোয় সংরক্ষণ করে থাকে। এতে দেশের ভেতরের সার্ভার বা ডেটা সেন্টারে হামলা হলেও বিকল্প স্থান থেকে তথ্য ও সেবা পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হয়। অন্যদিকে রাশিয়ার কঠোর তথ্য সংরক্ষণনীতির কারণে নির্দিষ্ট ধরনের তথ্য দেশের অভ্যন্তরেই সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ ডেটা ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো একই দেশের মধ্যে কেন্দ্রীভূত থাকলে সেগুলো হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে রাশিয়ার বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তথ্য সংরক্ষণের কৌশল নতুন করে পর্যালোচনা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিকল্প ডেটা সেন্টার, ব্যাকআপ ব্যবস্থা এবং দেশের বাইরে তথ্য সংরক্ষণের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে। তবে রাশিয়ার তথ্য সংরক্ষণসংক্রান্ত আইন ও জাতীয় নিরাপত্তানীতির কারণে এ ধরনের পরিবর্তন বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না। একই সঙ্গে দেশের ডিজিটাল অবকাঠামোকে বৈশ্বিক প্রযুক্তি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত রাখা এবং আন্তর্জাতিক সেবা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকি কমানোও দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
রাশিয়ার প্রযুক্তি খাতে ইয়ানডেক্সের গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সার্চ ইঞ্জিনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি রাইড শেয়ারিং, ই-কমার্স, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিভিন্ন সেবা পরিচালনা করে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির ডেটা সেন্টার ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু একটি সেবা নয়, বরং একাধিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কার্যক্রমে প্রভাব পড়তে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়ানডেক্স কয়েক দিনের মধ্যে কিছু সেবা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হলেও দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা কঠিন হতে পারে।
এ ছাড়া বিশ্ববাজারে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর ও কম্পিউটার চিপের সরবরাহসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা রাশিয়ার জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত সার্ভার, নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং ব্যবস্থা প্রতিস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহ ও স্থাপন সময়সাপেক্ষ হতে পারে। বিশেষ করে এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও পরিচালনায় ব্যবহৃত শক্তিশালী প্রসেসর এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো পুনর্গঠনে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার ডেটা সেন্টারগুলোর ক্ষয়ক্ষতি দেশটির ডিজিটাল অর্থনীতি ও প্রযুক্তি খাতের দুর্বলতাগুলো সামনে নিয়ে এসেছে। তাৎক্ষণিকভাবে বিভিন্ন অনলাইন সেবার কার্যক্রম পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে এআই উন্নয়ন, তথ্য সংরক্ষণের নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। তবে রাশিয়ার এআই খাতে প্রকৃত ক্ষতির মাত্রা কতটা হবে, তা নির্ভর করবে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠন, বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশ সংগ্রহের সক্ষমতার ওপর।