সারাবিশ্ব
এল নিনোর প্রভাবে পেরুতে ভয়াবহ দাবানল, প্রাণ গেল ১২ জনের
এল নিনোর প্রভাবে তীব্র তাপপ্রবাহ ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুতে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দেশটিতে দাবানলে অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় কয়েকশ মানুষ গৃহহীন হয়েছেন। বুধবার (২২ অক্টোবর) দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানিয়েছে।
পেরুর জাতীয় জরুরি কার্যক্রম কেন্দ্র (সিওইএন) জানায়, দাবানলে নিহত ব্যক্তিদের অধিকাংশই কৃষক। আগুন নেভানোর চেষ্টা করতে গিয়ে তারা আহত হন। পরে আহত অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়। দাবানলের কারণে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে কৃষি খাত ও বসতবাড়ি।
দাবানলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পেরুর কুসকো অঞ্চল। চলতি মাসের শুরুর দিকে ঐতিহাসিক ইনকা সভ্যতার নিদর্শন মাচু পিচুর কাছাকাছি এলাকায় একটি দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন মাচু পিচুর আশপাশে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় অঞ্চলটির পরিবেশ ও ঐতিহাসিক স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পেরুতে মোট ৪৫৭টি দাবানলের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এসব আগুনে এক হাজার হেক্টরের বেশি কৃষিজমি পুড়ে গেছে। একই সঙ্গে প্রায় ১০০টি বাড়ি আগুনে ধ্বংস হয়েছে। ফলে বহু পরিবার তাদের ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
লিমার সায়েন্টিফিক ইউনিভার্সিটি অব দ্য সাউথের জীববিজ্ঞানী ড্যানিয়েল ভালে বলেন, এল নিনোর কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং শুষ্ক আবহাওয়ার সৃষ্টি হওয়ায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বার্তা সংস্থা এএফপিকে তিনি বলেন, এল নিনোর প্রভাবে পেরুর বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রচণ্ড গরম ও শুষ্ক বাতাসের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ ধরনের আবহাওয়া দাবানলের ঝুঁকি বাড়ানোর পাশাপাশি আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার কাজও কঠিন করে তুলছে।
তবে শুধু প্রাকৃতিক কারণেই নয়, মানুষের কর্মকাণ্ডও দাবানল ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফসল চাষের উপযোগী জমি তৈরি করতে পেরুর কৃষকেরা প্রায়ই ঝোপঝাড় ও আগাছায় আগুন দেন। অনুকূল আবহাওয়া না থাকলে এসব আগুন সহজেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে বড় ধরনের দাবানলে রূপ নিতে পারে। তীব্র তাপমাত্রা ও শুষ্ক পরিবেশের কারণে আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়।
সিওইএনের তথ্য অনুযায়ী, বুধবারও পেরুর আন্দিজ পর্বতমালা ও আমাজন অঞ্চলে অন্তত সাতটি দাবানল সক্রিয় ছিল। এসব এলাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। তবে দুর্গম অঞ্চল, শুষ্ক আবহাওয়া এবং আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতার কারণে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে উঠেছে।
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। এ সময় প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের মধ্য ও পূর্ব অংশের উপরিভাগের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যায়। এর ফলে বায়ুপ্রবাহ, বায়ুচাপ এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন ঘটে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রভাবে কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যা দেখা দেয়, আবার কোথাও তীব্র তাপপ্রবাহ ও খরা পরিস্থিতি তৈরি হয়।
চলতি বছরের সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনো ডিসেম্বর নাগাদ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে মধ্য আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পেরুর চলমান দাবানল পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, তীব্র গরম, দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক আবহাওয়া এবং মানুষের অসতর্ক কর্মকাণ্ড একসঙ্গে বড় ধরনের পরিবেশগত ও মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।