সারাবিশ্ব

কেন প্রকাশ্যে আসছেন না মোজতবা খামেনি?


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২৫ পিএম

কেন প্রকাশ্যে আসছেন না মোজতবা খামেনি?
ছবি: সংগৃহীত

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি কেন দীর্ঘদিন ধরে জনসমক্ষে আসছেন না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রশ্ন ও জল্পনা চলছে। এবার এ বিষয়ে মুখ খুলেছেন ভারতে নিযুক্ত ইরানের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক আবদুল মজিদ হাকিম এলাহি। তাঁর দাবি, নিরাপত্তাজনিত কারণেই জনসমক্ষে আসছেন না মোজতবা খামেনি। তবে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন এবং স্বাভাবিকভাবেই নিজের দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করছেন।

ভারতে আয়োজিত ‘এনডিটিভি ওয়ার্ল্ড সামিট ২০২৬’-এ অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন আবদুল মজিদ হাকিম এলাহি। মোজতবা খামেনিকে বিশ্ববাসী কেবল তাঁর সম্পর্কে শুনেছে, কিন্তু তাঁকে প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না-এমন প্রশ্নের জবাবে ইরানি এই কূটনীতিক বলেন, নিরাপত্তার স্বার্থেই সর্বোচ্চ নেতা গণমাধ্যমের সামনে আসছেন না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জনসমক্ষে অনুপস্থিত থাকলেও রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে সক্রিয় রয়েছেন মোজতবা খামেনি।

এলাহি জানান, গত সপ্তাহেই ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে মোজতবা খামেনির প্রায় সাত ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক হয়েছে। এ ছাড়া দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকারও তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বলে দাবি করেন তিনি। এসব তথ্য তুলে ধরে কূটনীতিকটি বোঝানোর চেষ্টা করেন, সর্বোচ্চ নেতা দায়িত্ব পালনে সক্রিয় থাকলেও নিরাপত্তার কারণে তাঁর প্রকাশ্য উপস্থিতি সীমিত রাখা হয়েছে।

মোজতবা খামেনির জনসমক্ষে অনুপস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে যে আলোচনা চলছে, সে প্রসঙ্গেও কথা বলেন এলাহি। তাঁর দাবি, মোজতবা খামেনি তাঁর বাবা আলী খামেনির জানাজায় অংশ নিয়েছিলেন। এমনকি তিনি মাঝেমধ্যে রাতে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভেও যোগ দেন বলে দাবি করেন এই ইরানি কূটনীতিক। তবে এসব দাবির বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য এখানে উপস্থাপিত হয়নি।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে এক হামলায় দেশটির তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। ওই হামলায় তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনিও আহত হয়েছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তী সময়ে মার্চ মাসে তিনি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর থেকেই তাঁর প্রকাশ্য উপস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। তাঁর শারীরিক অবস্থা, নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে আসে।

সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন এলাহি। তিনি অভিযোগ করেন, ওই দিন ইরানের মিনাব শহরের একটি স্কুলে দুই দফা হামলা চালানো হয়েছিল, যাতে ১৬৮ জন নিরীহ শিশু প্রাণ হারায়। তাঁর দাবি, এ ঘটনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এখনো ক্ষমা চায়নি। তবে হামলার দায়, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করে এলাহি আরও বলেন, যুদ্ধে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে দেশ দুটি। তাঁর অভিযোগ, ওয়াশিংটন ইরানে সরকার পরিবর্তন, দেশটিকে পাঁচটি ভাগে বিভক্ত করা এবং দেশটির তেলসম্পদ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। তবে এসব লক্ষ্য অর্জনে তারা সফল হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। বরং নেতৃত্বে পরিবর্তন আসার পর ইরান আগের তুলনায় আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে মন্তব্য করেন এই কূটনীতিক।

এদিকে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি নিয়েও বক্তব্য দেন এলাহি। তাঁর ভাষ্য, হাজার হাজার বছর ধরে এই নৌপথ উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে এবং প্রণালিটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ রয়েছে।

ভারত-ইরান সম্পর্কের প্রসঙ্গ টেনে এলাহি দুই দেশের ঘনিষ্ঠতার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। তিনি ভারত ও ইরানের সম্পর্ককে ‘একই বইয়ের একটি পৃষ্ঠার দুই পিঠ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, ব্রিকসের সভাপতি হিসেবে ভারত মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ভারতের কূটনৈতিক উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।

সব মিলিয়ে, মোজতবা খামেনির জনসমক্ষে অনুপস্থিতি নিয়ে চলমান জল্পনার মধ্যে ইরানি কূটনীতিকের এই বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, নিরাপত্তার কারণেই সর্বোচ্চ নেতাকে প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না এবং তিনি স্বাভাবিকভাবেই দায়িত্ব পালন করছেন। তবে মোজতবা খামেনির বর্তমান শারীরিক অবস্থা ও তাঁর প্রকাশ্য উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এবং নির্ভরযোগ্য প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ।