সারাবিশ্ব

খ্রিস্টধর্ম প্রচারে সৌদি আরবে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ, সিস্টার ডেইজির জীবনে কী ঘটেছিল?


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪৪ পিএম

খ্রিস্টধর্ম প্রচারে সৌদি আরবে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ, সিস্টার ডেইজির জীবনে কী ঘটেছিল?
ছবি: সংগৃহীত

খ্রিস্টধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের এক ধর্মপ্রাণ ক্যাথলিক নারী। কিন্তু সেই দেশেই মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস, আজানের সুর এবং পবিত্র কোরআনের বাণী তাঁকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। দীর্ঘ সাত বছর ধরে বাইবেল ও কোরআন অধ্যয়ন এবং সত্যের অনুসন্ধানের পর শেষ পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করেন বলে জানা যায় সিস্টার ডেইজি নামে পরিচিত ওই নারী। তাঁর জীবনের এই পরিবর্তনের পেছনে কী ঘটনা কাজ করেছিল, কীভাবে বদলে গিয়েছিল তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাস-তা নিয়েই রয়েছে নানা আলোচনা।

ধর্মপ্রাণ ক্যাথলিক পরিবারে বেড়ে ওঠা

সিস্টার ডেইজির জীবনকাহিনি অনুযায়ী, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় একটি ধর্মপ্রাণ আইরিশ ক্যাথলিক পরিবারে বেড়ে ওঠেন। ছোটবেলা থেকেই পরিবার ও গির্জার ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে তাঁর বেড়ে ওঠা। এর ফলে খ্রিস্টধর্মের প্রতি গভীর বিশ্বাস ও ধর্মীয় মূল্যবোধ তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে তিনি ধর্মীয় বিশ্বাস ও আদর্শ নিয়ে আরও গভীরভাবে ভাবতে শুরু করেন।

একপর্যায়ে মার্কিন দূতাবাসের শিক্ষিকা হিসেবে সৌদি আরবে যাওয়ার সুযোগ পান তিনি। নতুন দেশে যাওয়ার এই সুযোগকে নিজের ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে দেখেছিলেন বলে তাঁর জীবনকাহিনিতে উল্লেখ করা হয়। সেখানে গিয়ে নিজের বিশ্বাস ও ধর্মীয় মূল্যবোধ অন্যদের কাছে তুলে ধরার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। তবে সৌদি আরবে অবস্থানকালে এমন কিছু অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, যা ধীরে ধীরে তাঁর চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আনে।

মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস তাঁকে ভাবিয়ে তোলে

সৌদি আরবে গিয়ে মুসলমানদের ধর্মীয় জীবনযাপন, নিয়মিত নামাজ আদায় এবং আল্লাহর প্রতি তাঁদের গভীর আনুগত্য তাঁকে আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে ইসলামে ঈসা (আ.) ও মরিয়ম (আ.)-এর প্রতি শ্রদ্ধার বিষয়টি তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। খ্রিস্টধর্মে যিশু ও তাঁর মা মেরির বিশেষ অবস্থান সম্পর্কে আগে থেকেই জানতেন তিনি। কিন্তু ইসলামেও তাঁদের সম্মানজনক অবস্থান রয়েছে-এই বিষয়টি তাঁকে নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।

পবিত্র কোরআনে ঈসা (আ.)-এর জন্ম, তাঁর মায়ের মর্যাদা এবং তাঁর নবুয়ত সম্পর্কে যে বর্ণনা রয়েছে, তা ডেইজির কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দেয় বলে তাঁর জীবনকাহিনিতে দাবি করা হয়। আগে যেসব বিষয়কে তিনি একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতেন, সেগুলো এবার অন্যভাবে বোঝার চেষ্টা করেন। ইসলামের বিশ্বাস, ধর্মীয় শিক্ষা এবং খ্রিস্টধর্মের সঙ্গে এর মিল ও অমিল সম্পর্কে জানার আগ্রহ ক্রমেই বাড়তে থাকে।

সাত বছর ধরে সত্যের অনুসন্ধান

ডেইজির জীবনের এই পরিবর্তন একদিনে ঘটেনি বলে প্রচলিত বর্ণনায় উঠে এসেছে। বরং দীর্ঘ সাত বছর ধরে তিনি ধর্মীয় বিশ্বাস ও সৃষ্টিকর্তার পরিচয় নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন। এ সময় বাইবেল ও পবিত্র কোরআন অধ্যয়ন করে দুই ধর্মের মূল শিক্ষা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন। সৃষ্টিকর্তার একত্ব, নবীদের ভূমিকা এবং ঈসা (আ.)-এর পরিচয়-এসব বিষয় তাঁর অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

ইসলামের একত্ববাদের ধারণা তাঁকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল বলে তাঁর জীবনকাহিনিতে উল্লেখ করা হয়। ইসলাম অনুযায়ী, আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয় এবং ঈসা (আ.) আল্লাহর একজন সম্মানিত নবী। অন্যদিকে খ্রিস্টধর্মের বিভিন্ন শাখায় যিশুর পরিচয় ও ঈশ্বরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিষয়ে স্বতন্ত্র ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা রয়েছে। দুই ধর্মের এই মৌলিক বিশ্বাসগুলো নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে ডেইজি নিজের পূর্ববর্তী ধারণাগুলো পুনর্বিবেচনা করেন বলে জানা যায়।

মসজিদে গিয়ে ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত

প্রচলিত জীবনকাহিনি অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের অনুসন্ধানের পর একপর্যায়ে ডেইজি তাঁর সন্তানদের নিয়ে একটি মসজিদে যান। সেখানে নামাজ ও মুসলমানদের ধর্মীয় আচারের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে বলে বর্ণনা করা হয়। প্রথমবারের মতো সেজদায় অবনত হওয়ার সময় তাঁর চোখে অশ্রু এসেছিল এবং তিনি গভীর মানসিক প্রশান্তি অনুভব করেছিলেন-এমন বর্ণনাও তাঁর কাহিনিতে পাওয়া যায়।

এরপর তিনি ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন বলে দাবি করা হয়। তাঁর এই সিদ্ধান্ত শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাসের পরিবর্তন ছিল না; বরং দীর্ঘদিনের প্রশ্ন, অধ্যয়ন এবং আত্মিক অনুসন্ধানের পর নেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে তাঁর জীবনকাহিনিতে তুলে ধরা হয়। আরও বলা হয়, তাঁর এই পরিবর্তন পরবর্তী সময়ে মেয়েকেও প্রভাবিত করেছিল। তবে তাঁর ইসলাম গ্রহণের সুনির্দিষ্ট সময়, ঘটনাগুলোর বিস্তারিত বিবরণ এবং মেয়ের ধর্মান্তরের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য সীমিত।

ডেইজির জীবনকাহিনি থেকে কী জানা যায়?

সিস্টার ডেইজির নামে প্রচলিত এই কাহিনি ধর্মীয় বিশ্বাস, অনুসন্ধিৎসা এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের একটি আলোচিত উদাহরণ। ভিন্ন ধর্মের মানুষের বিশ্বাস ও জীবনযাপন কাছ থেকে দেখা অনেক সময় নতুন প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ধর্মীয় গ্রন্থ অধ্যয়ন, বিভিন্ন মতাদর্শ সম্পর্কে জানা এবং নিজের উপলব্ধি যাচাই করার বিষয়গুলো এ কাহিনিতে গুরুত্ব পেয়েছে।

তবে ডেইজির জীবনের ঘটনাগুলো সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য জীবনী, প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎকার কিংবা প্রামাণ্য নথি ছাড়া প্রচলিত সব বিবরণকে নিশ্চিত ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। তাঁর ধর্মান্তরের গল্পটি মানুষের কাছে অনুপ্রেরণামূলক হিসেবে আলোচিত হলেও, এর নির্দিষ্ট ঘটনাপ্রবাহ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য আরও নির্ভরযোগ্য সূত্র প্রয়োজন।