সারাবিশ্ব

ইরানে হামলা নিয়ে দ্বিধায় যুক্তরাষ্ট্র, ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে স্পষ্ট বিভক্তি


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৫৩ এএম

ইরানে হামলা নিয়ে দ্বিধায় যুক্তরাষ্ট্র, ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে স্পষ্ট বিভক্তি
ছবি: সংগৃহীত

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দিন দিন আরও ব্যাপক আকার ধারণ করছে। পশ্চিম এশিয়ার দেশটিতে সহিংসতায় ইতোমধ্যে পাঁচ শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা দাবি করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে ইরানের পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে—তা নিয়ে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণী মহলে তীব্র মতভেদ দেখা দিয়েছে। নিষেধাজ্ঞা ও সাইবার ব্যবস্থার পাশাপাশি সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়টি আলোচনায় থাকলেও এর সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন মার্কিন সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি বড় অংশ।

সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডের বরাতে জানা যায়, ইরানে চলমান গণবিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য মার্কিন প্রতিক্রিয়া নিয়ে মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ব্রিফ করার কথা রয়েছে। প্রভাবশালী মার্কিন দৈনিক ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বৈঠকে ইরানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিকল্প পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হবে। এসব বিকল্পের মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করা, সাইবার হামলা জোরদার করা এবং প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা।

তবে সংশ্লিষ্ট মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই পর্যায়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা কম। আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইনের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

এদিকে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক মন্তব্যে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা বলেন, সম্ভাব্য কোনো হামলার আগে সেনা মোতায়েন ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির জন্য আরও সময় দরকার হবে। তার মতে, এ সময়ের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন অবস্থান সুসংহত করা এবং ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।

মার্কিন প্রশাসনের ভেতর থেকেই সতর্ক করে বলা হচ্ছে, সামরিক পদক্ষেপের ফল হতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিপজ্জনক। এতে ইরানের সাধারণ জনগণ সরকারের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যেতে পারে কিংবা পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে পাল্টা হামলা ও সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মূলত গত ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের ব্যাপক অবমূল্যায়ন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা দ্রুত সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। এ পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে তেহরানকে সতর্ক করে বলেছেন, বিক্ষোভ দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হলে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে পারে। তবে ইরানি কর্মকর্তারা ট্রাম্পের এসব বক্তব্যকে ‘বেপরোয়া হস্তক্ষেপ’ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান দলের একাধিক আইনপ্রণেতাও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। রোববার টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে অন্তত দুই মার্কিন সিনেটর সতর্ক অবস্থান নেন। রিপাবলিকান সিনেটর র‌্যান্ড পল এবিসি নিউজকে বলেন, “ইরানে বোমা হামলা চালালে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে—এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই।”

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, ইরানে চলমান বিক্ষোভে এ পর্যন্ত ৪৯০ জন বিক্ষোভকারী এবং ৪৮ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন। সংস্থাটির দাবি অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহে ১০ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ইরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে হতাহতের কোনো সংখ্যা প্রকাশ করেনি। বার্তাসংস্থা রয়টার্সও এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।

রোববার রাতে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, “সামরিক বাহিনী বিষয়টি পর্যালোচনা করছে এবং আমরা কিছু খুব শক্ত বিকল্প নিয়ে ভাবছি।” এর জবাবে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ ওয়াশিংটনকে ‘ভুল হিসাব’ না করার আহ্বান জানান। সাবেক রেভল্যুশনারি গার্ডস কমান্ডার কালিবাফ বলেন, “ইরানে হামলা হলে দখলকৃত ভূখণ্ড (ইসরায়েল)সহ যুক্তরাষ্ট্রের সব ঘাঁটি ও যুদ্ধজাহাজ আমাদের বৈধ লক্ষ্য হবে।”

উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরান বর্তমানে সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মুখে পড়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি, এই অস্থিরতার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইন্ধন রয়েছে। এর প্রতিবাদে সোমবার দেশজুড়ে ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নেতৃত্বাধীন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের’ বিরুদ্ধে সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছে।

এদিকে গত বৃহস্পতিবার থেকে ইরানে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকায় দেশটির ভেতরের প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় ইসরায়েলি তিনটি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের আশঙ্কায় ইসরায়েল সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে যুক্ত হয়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল। এর জবাবে ইরান ইসরায়েল এবং কাতারে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।