সারাবিশ্ব
‘ভারতীয় শ্বশুর-শাশুড়িকে ভালোবাসি’, এইচ-১বি ভিসা নিয়ে বিতর্কে ব্যাখ্যা দিলেন ভ্যান্স
যুক্তরাষ্ট্রের এইচ-১বি ভিসাধারী বিদেশি কর্মীদের ‘বিদেশি চুক্তিবদ্ধ দাস’ হিসেবে অভিহিত করে বিতর্কের মুখে পড়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। নিজের মন্তব্য নিয়ে সমালোচনার পর তিনি এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ভ্যান্স স্বীকার করেছেন, এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্যের ভাষা যথাযথ নাও হয়ে থাকতে পারে। তবে বিদেশি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্য মার্কিন নাগরিকদের কর্মসংস্থানের স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে নিজের অবস্থানে অনড় রয়েছেন তিনি। এ প্রসঙ্গে নিজের ভারতীয় শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি ভালোবাসার কথাও তুলে ধরেছেন মার্কিন এই ভাইস প্রেসিডেন্ট।
রোববার (১৮ অক্টোবর) প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এইচ-১বি ভিসাকর্মীদের নিয়ে করা আগের মন্তব্যের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে ভ্যান্স বলেন, তাঁর পরিবারের শিকড় কোথায়, তা সবার জানা। দক্ষিণ ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসিত হওয়া শ্বশুর-শাশুড়িকে তিনি ভালোবাসেন। তাঁদের মেয়ে উষা ভ্যান্স যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং বর্তমানে দেশটির সেকেন্ড লেডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। স্ত্রীকে নিয়ে তিনি গর্বিত এবং তাঁকে অত্যন্ত ভালোবাসেন বলেও উল্লেখ করেন ভ্যান্স।
তবে নিজের পারিবারিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরলেও বিদেশি কর্মী নিয়োগের বিষয়ে অবস্থান পরিবর্তন করেননি তিনি। ভ্যান্সের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় এমন ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন, যাতে বিদেশি পেশাজীবীদের সম্মান ও কাজের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি মার্কিন নাগরিকদের কর্মসংস্থানও সুরক্ষিত থাকে। তাঁর যুক্তি, কোনো প্রতিষ্ঠানে উপযুক্ত মার্কিন কর্মী পাওয়া গেলে শুধু বিদেশি কর্মী নিয়োগের উদ্দেশ্যে আগে থেকে কর্মরত স্থানীয় কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা ন্যায়সংগত নয়।
বিষয়টি বোঝাতে একটি উদাহরণও দেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, কোনো বড় প্রতিষ্ঠান যদি দাবি করে যে তাদের বর্তমান শ্রমবাজার থেকে একজন যোগ্য হিসাবরক্ষক পাওয়া যাচ্ছে না, অথচ একই পদে বিদেশ থেকে কর্মী নিয়ে এসে আগে থেকে বেতনভুক্ত একজন হিসাবরক্ষককে ছাঁটাই করে, তাহলে সেটি ন্যায্য আচরণ নয়। তাঁর মতে, এ ধরনের নিয়োগপ্রক্রিয়া মার্কিন কর্মীদের ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি বিদেশ থেকে আসা কর্মীদেরও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলতে পারে।
ভ্যান্সের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর সমালোচনার লক্ষ্য বিদেশি পেশাজীবীরা নন; বরং এমন কিছু নিয়োগপ্রক্রিয়া ও ভিসাব্যবস্থা, যার ফলে বিদেশি কর্মীরা নিয়োগকর্তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন। এইচ-১বি ভিসার ক্ষেত্রে কর্মীর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের সুযোগ তাঁর চাকরির সঙ্গে যুক্ত থাকায় নিয়োগকর্তার হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা চলে যেতে পারে বলেও তিনি যুক্তি দিয়েছেন।
এই বিতর্কের সূত্রপাত হয় চলতি মাসের শুরুতে, যখন ভ্যান্স মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থানীয় কর্মী নিয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান। সে সময় বিদেশি কর্মীদের ‘চুক্তিবদ্ধ দাস’ হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর মন্তব্য ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরবর্তী সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন মাইক্রোসফট, কগনিজ্যান্ট, ইনফোসিস, টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস (টিসিএস), উইপ্রো, এইচসিএল ও ক্যাপজেমিনিসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গ্রিন কার্ড-সংশ্লিষ্ট শ্রম সনদ প্রক্রিয়া বা পার্ম (PERM) কর্মসূচির আবেদন স্থগিত করার ঘোষণা দেয় বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এইচ-১বি ভিসা যুক্তরাষ্ট্রের একটি অস্থায়ী কর্মভিসা, যার মাধ্যমে দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষায়িত পেশায় দক্ষ বিদেশি কর্মীদের নিয়োগ দিতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, বিজ্ঞান ও চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই ভিসার ব্যবহার রয়েছে। ভারতীয় পেশাজীবীদের মধ্যে ভিসাটি বিশেষভাবে জনপ্রিয়। তবে বিদেশি কর্মী নিয়োগের ফলে স্থানীয় কর্মীদের চাকরির সুযোগ ও বেতন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে-এমন আশঙ্কা থেকে বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছে।
এদিকে, ভ্যান্সের ব্যবহৃত ‘চুক্তিবদ্ধ দাস’ শব্দবন্ধের সমালোচনা করেছে ভারতও। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মন্তব্যটিকে অনভিপ্রেত ও গভীরভাবে আপত্তিকর বলে উল্লেখ করেছে। মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত ভারতীয় পেশাজীবীরা দেশটির অর্থনীতি ও উদ্ভাবন খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তাঁদের অবদান উপেক্ষা করে এ ধরনের বর্ণনা দেওয়া যথাযথ নয়।
সব মিলিয়ে, এইচ-১বি ভিসা নিয়ে বিতর্কে ভ্যান্স একদিকে বিদেশি পেশাজীবীদের অবদানকে স্বাগত জানানোর কথা বলেছেন, অন্যদিকে মার্কিন কর্মীদের স্বার্থ রক্ষায় নিয়োগপ্রক্রিয়ায় ভারসাম্য আনার ওপর জোর দিয়েছেন। তবে তাঁর আগের মন্তব্য ও ভারত সরকারের প্রতিক্রিয়ার পর বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসননীতি এবং ভারতীয় পেশাজীবীদের কর্মসংস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।