জাতীয়

বেগম জিয়ার মৃত্যুতে ৩ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং ১ দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:২১ পিএম

বেগম জিয়ার মৃত্যুতে ৩ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং ১ দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: সংগৃহীত

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে সরকার। বুধবার থেকে শুক্রবার- ৩১ ডিসেম্বর এবং ১ ও ২ জানুয়ারি দেশব্যাপী এ রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হবে। একই সঙ্গে বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) সারা দেশে এক দিনের সাধারণ ছুটিও ঘোষণা করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) দুপুর ১২টায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এ ঘোষণা দেন।

ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে জাতি একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অভিভাবককে হারিয়েছে। গণতন্ত্র, বহুদলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তার অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার আপসহীন নেতৃত্ব বারবার দেশকে সঠিক পথের দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস বেগম খালেদা জিয়ার শোকসন্তপ্ত পরিবার, রাজনৈতিক সহকর্মী এবং বিএনপির নেতাকর্মীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। একই সঙ্গে তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দেশবাসীকে ধৈর্য ও সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।

প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, শোকের এই সময়ে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে এবং কোনো ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি যেন সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

উল্লেখ্য, বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মঙ্গলবার ভোর ৬টায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বিএনপি মিডিয়া সেলের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

এদিকে বিএনপির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত শোকবার্তায় বলা হয়, “বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজ সকাল ৬টায় ফজরের নামাজের পরপরই ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আমরা তার রূহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং সকলের কাছে তার জন্য দোয়া প্রার্থনা করছি।”

গত ২৩ নভেম্বর থেকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন ছিল বলে জানিয়েছেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন।

বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ইস্কান্দার মজুমদার এবং মাতা তৈয়বা মজুমদার। ১৯৬০ সালে তিনি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকাকালে তিনি ফার্স্ট লেডি হিসেবে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সফরে অংশ নেন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদতবরণের পর জাতীয় সংকটের মুহূর্তে রাজনীতিতে সক্রিয় হন বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়। ১৯৮৩ সালে তিনি দলের ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালে বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

আশির দশকে সামরিক স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। আপসহীন আন্দোলনের কারণে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। এই সময় সাত দলীয় জোট গঠন করে স্বৈরাচারের পতন না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তাকে সাতবার গ্রেপ্তার ও গৃহবন্দী করা হয়।

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার শাসনামলেই দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। শিক্ষা খাতে তিনি চালু করেন বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা ও উপবৃত্তি কর্মসূচি। পাশাপাশি সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ২৭ থেকে ৩০ বছরে উন্নীত করা হয়।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করতে না পারলেও তিনি ১১৬ আসন নিয়ে সংসদে বৃহত্তম বিরোধী দলীয় নেত্রীর ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে চারদলীয় জোট গঠন করেন এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০৫ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন তাকে বিশ্বের প্রভাবশালী নারীদের তালিকায় ২৯তম স্থানে স্থান দেয়।

বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া কখনো কোনো আসনে পরাজিত না হওয়ার বিরল রেকর্ডের অধিকারী। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি যে কয়টি আসনে নির্বাচন করেছেন, সবগুলোতেই বিজয় অর্জন করেন। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি স্টেট সিনেট গণতন্ত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে ‘ডেমোক্রেসি ফাইটার’ উপাধিতে ভূষিত করে।

২০১৮ সালে একটি বিতর্কিত মামলায় তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়, যা আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বহু আইন বিশেষজ্ঞ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও এ বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর একে একে সব মামলায় তিনি খালাস পান।