জাতীয়

সারাদেশে তীব্র এলপিজি সংকট, বন্ধের পথে রেস্তোরাঁ!


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:৪৫ পিএম

সারাদেশে তীব্র এলপিজি সংকট, বন্ধের পথে রেস্তোরাঁ!
ছবি: সংগৃহীত

সারাদেশজুড়ে নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করেছে এলপিজি গ্যাসের সংকট। রাজধানী ঢাকায় সীমাবদ্ধ না থেকে এ সংকট এখন গ্রাম-শহর সবখানেই ছড়িয়ে পড়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন হোটেল ও রেস্তোরাঁ মালিকরা। জ্বালানি সরবরাহের এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে ব্যবসা বন্ধ করা ছাড়া উপায় থাকবে না বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও নগর এলাকায় গৃহস্থালি থেকে শুরু করে হোটেল-রেস্তোরাঁ সবখানেই রান্নার জ্বালানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ নেমে এসেছে চার ভাগের এক ভাগে। কোথাও সিলিন্ডার মিলছে না, আবার কোথাও পাওয়া গেলেও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে।

অধিকাংশ খুচরা বিক্রেতার কাছে এলপিজি সিলিন্ডারের মজুত নেই বললেই চলে। যেসব দোকানে কিছু সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে সুযোগ বুঝে অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ ভোক্তাদের।

এলপিজি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে ছোট ও মাঝারি হোটেল-রেস্তোরাঁয়। অনেক মালিক বাধ্য হয়ে দোকান খোলার সময় কমিয়ে দিয়েছেন, কেউ কেউ আবার জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য মেনু সীমিত করছেন। তবুও লোকসান এড়ানো যাচ্ছে না।

এই সংকট শুধু রাজশাহীতেই সীমাবদ্ধ নয়; চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, সিলেটসহ দেশের প্রায় সব শহর এলাকাতেই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।

এমন প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি এলপিজি সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং খাতভিত্তিক নানা সমস্যার কথা তুলে ধরে। সংগঠনটি রেস্তোরাঁ খাতে পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ বাড়াতে তিতাসসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর দ্রুত পদক্ষেপ দাবি করে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৪ লাখ ৩৬ হাজার হোটেল ও রেস্তোরাঁ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে সরাসরি কর্মরত আছেন প্রায় ৩০ লাখ মানুষ। রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি জানায়, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ খাতের সঙ্গে যুক্ত প্রায় দুই কোটি মানুষ। তবে পর্যাপ্ত পাইপলাইনের গ্যাস না থাকায় দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ রেস্তোরাঁ এলপিজির ওপর নির্ভরশীল।

সংগঠনের মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, “দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে মানুষ এমনিতেই রেস্তোরাঁয় কম আসছে। এর ওপর ডিসেম্বর থেকে এলপিজির তীব্র সংকট শুরু হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে লোকসানে পড়েছে। কর্মীদের কথা ভেবে এখনো বন্ধ করা হয়নি, কিন্তু এভাবে চললে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে।”

তিনি আরও বলেন, “জ্বালানি সংকট নিরসন না হলে খাবারের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়। সরকারকে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি রেস্তোরাঁ খাতে ১২টি সংস্থার তদারকির বদলে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা জরুরি।”

গত দুই সপ্তাহ ধরে দেশে এলপিজির তীব্র সংকট চলছে। বাজারে ১২ কেজির সিলিন্ডার সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৩০৬ টাকার পরিবর্তে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায়ও পাওয়া যাচ্ছে না। এর প্রভাব পড়েছে অটোগ্যাস, শিল্প ও অন্যান্য জ্বালানি-নির্ভর খাতেও।

জ্বালানি বিভাগ ও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে বৈঠক করলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। যদিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে, বাজার এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি জানায়, দেশে প্রতি মাসে গড়ে ১ লাখ ২০ হাজার টন এলপিজি সরবরাহ হয়, যার প্রায় ২৫ শতাংশ ব্যবহৃত হয় হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতে। সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধিতে জ্বালানি খরচ বেড়েছে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত।

সংবাদ সম্মেলনে মালিকরা অভিযোগ করেন, আগের সরকারের সময় কৃত্রিমভাবে প্রাকৃতিক গ্যাস সংকট দেখিয়ে রেস্তোরাঁ খাতে গ্যাস সংযোগ বন্ধ করা হয়েছে। এর ফলে এলপিজি ব্যবসা একটি বেসরকারি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। গণ-অভ্যুত্থানের পরও সেই সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব হয়নি।

তারা আরও জানান, যেসব রেস্তোরাঁয় তিতাসের সংযোগ রয়েছে, সেখানেও পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। অতিরিক্ত দামে এলপিজি কিনে খাবারের দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন তারা, ফলে গ্রাহক কমছে এবং লোকসান বাড়ছে।