জাতীয়
দেশেই অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী
পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সশস্ত্র বাহিনীকে আরও আধুনিক, দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশেই প্রতিরক্ষা শিল্প প্রতিষ্ঠায় সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়ার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।
একই সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং অবসর-পরবর্তী আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘ওয়ান র্যাংক, ওয়ান পেনশন’ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
রোববার সকালে নবম পদাতিক ডিভিশনের আয়োজনে সেনাবাহিনীর কয়েকটি ব্যাটালিয়ন ও রেজিমেন্টকে ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড বা জাতীয় পতাকা প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে মন্ত্রিসভার সদস্য, উপদেষ্টা, সেনাবাহিনী প্রধান, বিদেশি কূটনীতিক এবং সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে পেশাগত সাফল্য, দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠা ও বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সেনাবাহিনীর সাতটি ইউনিটকে জাতীয় পতাকা প্রদান করা হয়। ইউনিটগুলো হলো-৭ ও ৩২ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি, ২৫ এয়ার ডিফেন্স রেজিমেন্ট, ৯ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন, ৫৬ ও ৫৭ ইস্ট বেঙ্গল এবং প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট (পিজিআর)।
জাতীয় পতাকা অর্জনকারী ইউনিটগুলোকে অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড কেবল একটি পতাকা নয়; এটি একটি ইউনিটের ইতিহাস, ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা, আত্মত্যাগ, পেশাদারত্ব ও দেশের প্রতি অঙ্গীকারের প্রতীক। এ সম্মান অর্জনের মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোর দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষায় সর্বোচ্চ নিষ্ঠা, সাহসিকতা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নতুন শপথ নিতে হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্বে জাতীয় নিরাপত্তার ধারণা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রচলিত স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথের নিরাপত্তার পাশাপাশি সাইবার স্পেস, মহাকাশ, ড্রোন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং তথ্যভিত্তিক সক্ষমতা এখন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এ পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিকে সময়োপযোগী করে গড়ে তোলা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সশস্ত্র বাহিনীকে প্রযুক্তিগতভাবে আরও সক্ষম করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি, আধুনিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং উন্নত প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে প্রয়োজনের সময় তিন বাহিনী সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে।
দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প প্রতিষ্ঠার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রয়োজনীয় অস্ত্র, গোলাবারুদ ও অন্যান্য প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের উৎপাদন সক্ষমতা দেশে গড়ে তোলার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমানো, নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় নিরাপত্তা আরও সুদৃঢ় করার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের কল্যাণে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, জাতীয় পে-স্কেলে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৩৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া সেনাসদস্যদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ‘ওয়ান র্যাংক, ওয়ান পেনশন’ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের আবাসন, চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং অবসর-পরবর্তী সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। দায়িত্ব পালনকালে তাঁদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অবসরের পরও যেন তাঁরা সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারেন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দেশের অভ্যন্তরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জরুরি পরিস্থিতি ও বিভিন্ন সংকট মোকাবিলায় সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সামরিক সদস্যদের অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়েই সেনাবাহিনীর জন্ম। এ ইতিহাস দেশের সামরিক বাহিনীর আত্মপরিচয় ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এ সময় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর আক্রমণ শুরু করলে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তৎকালীন উপ-অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। পরে ২৬ মার্চ সশস্ত্র প্রতিরোধের নির্দেশ দেন এবং ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, যা দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে।
জিয়াউর রহমানের লেখা ‘একটি জাতির জন্ম’ নিবন্ধের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সেনাবাহিনীর জন্ম ও বিকাশ গভীরভাবে জড়িত। এ কারণে দেশের জনগণ সেনাবাহিনীর সাফল্যকে বাংলাদেশের সাফল্যের অংশ হিসেবে দেখে।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় স্বার্থ, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদা রক্ষা করাই আগামীর বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সমতা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে চায় বাংলাদেশ। একই সঙ্গে একটি আধুনিক, দক্ষ ও আত্মনির্ভরশীল সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।