জাতীয়
পদত্যাগের স্ট্যাটাসে চ্যাটজিপিটির নির্দেশনা, ইশরাককে নিয়ে ফেসবুকে সমালোচনা
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের ঘোষণা নিয়ে দেওয়া ফেসবুক স্ট্যাটাসে চ্যাটজিপিটির নির্দেশনা রয়ে যাওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। স্ট্যাটাসের শুরুতে লেখাটি সম্পাদনার নির্দেশনা এবং শেষে সংশোধনসংক্রান্ত মন্তব্য থাকায় বিষয়টি নিয়ে ব্যঙ্গ করছেন অনেকে। পোস্টটি দেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে তিনি সেটি সরিয়ে নেন। পরে আরেকটি স্ট্যাটাস দেন।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকালে দেওয়া পোস্টের শুরুতে লেখা ছিল, “বানান, ব্যাকরণ ও যতিচিহ্ন সংশোধন করে মূল বক্তব্য ও আবেগ অক্ষুণ্ণ রেখে লেখাটি সাজিয়ে দেওয়া হলো।”
অন্যদিকে, পোস্টের শেষে উল্লেখ ছিল, “শেষের স্লোগানে আপনার মূল বক্তব্য অনুযায়ী ‘মন্ত্রী না’ পরিবর্তন করে ‘মন্ত্রী নয়’ করা হয়েছে। এ ছাড়া ‘১০০ গান’ সংশোধন করে ‘শতগুণ’, ‘পরিচ্ছত্ন’ সংশোধন করে ‘পরিচ্ছন্নতা’ এবং ‘উল্লাস সূচক লেখা লেখতে’ সংশোধন করে ‘উল্লাসসূচক লেখালেখি’ করা হয়েছে।”
পোস্টটি ছড়িয়ে পড়ার পর ফেসবুকে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ বিষয়টি নিয়ে ব্যঙ্গ করেছেন, আবার কেউ পোস্ট প্রকাশের আগে যথাযথভাবে যাচাই না করার সমালোচনা করেছেন।
তোলন নামের এক ব্যক্তি স্ট্যাটাসটি শেয়ার করে লেখেন, ‘ইশরাক ভাই সকাল বেলা দুইটা পোস্ট দিলো। দুইটাই চ্যাটজিপিটি দিয়া লিখছে। এটা আসলে দোষের কিছু না কিন্তু পোস্ট করার আগে চ্যাক করার দরকার ছিলো।’
তৌফিক আহমেদ মূসা নামের একজন লেখেন, ‘ইশরাক না চ্যাটজিপিটি, চ্যাটজিপিটি চ্যাটজিপিটি’।
মো. কেফায়েতুল্লাহ নামের একজন লেখেন, ‘একটা প্রতিমন্ত্রীর চ্যাটজিপিটি দিয়ে সাজানো পোস্ট এমন লেতা (নেতা) পেয়ে আমরা আসলেই গর্বিত’।
মোস্তাকিম বিল্লাহ নামের একজন শিক্ষার্থী লেখেন, ‘ওদিকে একজন মন্ত্রী চ্যাটজিপিটি থেকে ফেসবুক পোস্ট লিখে নেয়, আর আমরা চ্যাটজিপিটি দিয়ে এসাইনমেন্ট করলেই দোষ।’
পোস্টের শুরু ও শেষে সম্পাদনাসংক্রান্ত অপ্রাসঙ্গিক বাক্য থাকায় এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় তৈরি বা সম্পাদনা করা হয়েছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ওই স্ট্যাটাসে ইশরাক হোসেন লেখেন, “আজ দুপুর ২টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দেব এবং সাংবাদিকদের মুখোমুখি হব, ইনশাআল্লাহ। ফেসবুকে কিছু সুশীল মানুষকে উল্লাসসূচক লেখালেখি করতে দেখলাম। আশা করি, ভবিষ্যতে কখনো আন্দোলন-সংগ্রামের প্রয়োজন হলে তাঁরা জাতীয়তাবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বিদেশ থেকে দেশে এসে সেই আন্দোলনে যোগ দেবেন।”
তিনি আরও লেখেন, “এবার সংসদ সদস্য বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নয়, একজন বিএনপি কর্মী হিসেবে মাদকের বিরুদ্ধে শতগুণ বেশি উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করব, ইনশাআল্লাহ। পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি আরও জোরদার হবে। দেশব্যাপী প্রজন্ম দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন জেলা সফর করতে পারব। মন্ত্রী নয়, মাদক নির্মূল! মাদক নির্মূল, মাদক নির্মূল।”
এর আগে, রবিবার (১৮ অক্টোবর) দিবাগত রাতে দেওয়া এক ফেসবুক পোস্টে ইশরাক হোসেন লিখেছিলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে মন্ত্রিপরিষদের যে কোনো সদস্যের প্রতি পদত্যাগ অথবা অন্য যে কোনো নির্দেশ আসার সাথে সাথে সেটি কার্যকর করা প্রথাগতভাবে বাধ্যতামূলক অথবা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা কার্যকর হয়ে যায়। অতএব এই সংক্রান্ত কোনো তথ্য তৃতীয়, চতুর্থ, অথবা আরো দূরবর্তী কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে যাচাই করার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই।”
তিনি আরও লেখেন, “মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় অথবা আমার ক্ষেত্রে এই ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত। কার্যকর হওয়া মাত্রই দ্রুততম সময়ে সংবাদ সম্মেলন করে দেশবাসীকে বিস্তারিত জানানো হবে ইনশাআল্লাহ।”
এরও আগে, ইশরাকের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক বিবৃতিতে তার পদত্যাগের খবরকে অসত্য, ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে তাকে পদত্যাগের কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি এবং তার পদত্যাগের প্রশ্নও ওঠে না।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, প্রতিমন্ত্রী তার সরকারি ও রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। একটি মহল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল এবং জনসাধারণের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াতে এ ধরনের তথ্য প্রচার করছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ার ঘটনা নিয়েও বিবৃতিতে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন ইশরাক। তার দাবি, নিজ সংসদীয় আসনে মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আত্মরক্ষার জন্য আইনসম্মতভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করেছিলেন তিনি। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পদত্যাগের খবর ছড়ানোকে বেআইনি ও সাংবাদিকতার নীতিমালার পরিপন্থী বলে উল্লেখ করা হয়।
এর আগে রাজধানীতে অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়ে আলোচনায় আসেন ইশরাক হোসেন। তার এ কর্মকাণ্ড নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। পরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিতে সেখানে গিয়েছিলেন। পুলিশ, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও সামাজিক নেতাদের যৌথ সিদ্ধান্তে কর্মসূচিটি নেওয়া হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
ইশরাকের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে অভিযানের একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছিল, যেখানে পিস্তলের ছবি অস্পষ্ট করে দেওয়া হয়। তবে ভিডিওর কিছু অংশে আগ্নেয়াস্ত্রের স্পষ্ট ছবি দেখা যায়।
ইশরাকের ভাষ্য, ঢাকা ৬ আসনের গেন্ডারিয়ার বিভিন্ন এলাকায় মাদক কারবারের অভিযোগ পাওয়ার পর থেকেই তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করছিলেন। জনবলসংকট দূর করা এবং মাদকের আস্তানার কাছে স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। তবে এতে সমস্যার সমাধান হয়নি।
বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, অভিযানের আগে জানতে পারেন, মাদক কারবারিরা ছাদ থেকে গুলি চালাতে পারে। একটি অস্থায়ী মাদকের আস্তানার কাছে পৌঁছানোর পর ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যক্তি হইচই করে তাদের গাড়িবহরের দিকে মারমুখী ভঙ্গিতে এগিয়ে আসেন। সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় নিজের ও অন্যদের নিরাপত্তার জন্য তিনি এবং তার সরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা অল্প সময়ের জন্য অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে অস্ত্র সরিয়ে নেওয়া হয়।
তার দাবি, হাতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্রটি বৈধ ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত। আত্মরক্ষার জন্যই সেটি প্রদর্শন করা হয়েছিল এবং এতে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।
বিবৃতিতে ইশরাক আরও দাবি করেন, অভিযানে চার থেকে পাঁচটি অস্থায়ী মাদকের আস্তানা উচ্ছেদ করা হয়েছে। সেখান থেকে মাদকদ্রব্য, অস্ত্র, নগদ অর্থ ও ছিনতাই করা মুঠোফোন জব্দ করা হয়। ছয়জনকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। এসব তথ্য উপেক্ষা করে কয়েকটি গণমাধ্যম ঘটনার খণ্ডিত চিত্র তুলে ধরেছে বলে অভিযোগ করেন প্রতিমন্ত্রী। একই সঙ্গে মাদকবিরোধী কার্যক্রম অব্যাহত রাখার কথাও জানান তিনি।