জাতীয়

এলডিসি উত্তরণ পেছানোর সিদ্ধান্ত অক্টোবরে, আশাবাদী বাণিজ্যমন্ত্রী


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২৫ পিএম

এলডিসি উত্তরণ পেছানোর সিদ্ধান্ত অক্টোবরে, আশাবাদী বাণিজ্যমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার বিষয়ে চলতি অক্টোবরের মধ্যেই সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বাড়তি সময় পাওয়া গেলে তা কাজে লাগিয়ে উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদার করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি, এলডিসি থেকে উত্তরণের আগেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) আলোচনা শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

সোমবার রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) মিলনায়তনে বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই) ও ইআরএফের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব কথা বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। ‘বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের গতিপথ: গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ ও নীতিগত বিকল্প অনুসন্ধান’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন।

বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ পেছানোর প্রক্রিয়ার অগ্রগতি সম্পর্কে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) সংশ্লিষ্ট ধাপ অতিক্রম করার পর তিন বছর সময় বাড়ানোর বিষয়ে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদে (ইকোসক) প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোও বাংলাদেশকে বাড়তি সময় দেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে।

সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য সময় সম্পর্কে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমি খুবই আশাবাদী, সামনের সপ্তাহ বা তার পরের সপ্তাহে আমরা জিনিসটার একটা নিষ্পত্তি দেখব।’ আগামী ২৪ নভেম্বরের নির্ধারিত সময়সীমার আগেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বাংলাদেশ কেন তিন বছর বাড়তি সময় চেয়েছে, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের প্রস্তুতি যথেষ্ট ছিল না। তাঁর মতে, উত্তরণ নিয়ে রাজনৈতিকভাবে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও এর অর্থনৈতিক ও আর্থিক প্রভাব মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির ওপর প্রত্যাশিত মনোযোগ দেওয়া হয়নি। উত্তরণের সম্ভাব্য সুবিধা কাজে লাগানো এবং অসুবিধাগুলো মোকাবিলায় সক্ষমতা তৈরির ক্ষেত্রে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বাড়তি সময় পাওয়া গেলে তা কীভাবে কাজে লাগানো হবে, সে বিষয়ে সরকার একটি সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। এ পরিকল্পনা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, এই সময়কে কাজে লাগিয়ে রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানো, নতুন বাজার তৈরি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে।

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পণ্য ও সেবার প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি জানান, ২০২৬ ও ২০২৭ সালের মধ্যে আট থেকে দশটি দেশের সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) অথবা মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। এসব চুক্তির মাধ্যমে রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও সরকারের প্রস্তুতির কথা তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি জানান, এফটিএ আলোচনার জন্য প্রধান আলোচক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং প্রথম দফার কারিগরি আলোচনা শুরুর প্রস্তুতি চলছে। তবে আলোচনার নির্দিষ্ট দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের আগেই ইইউর সঙ্গে আলোচনা শেষ করতে চান তাঁরা।

ইইউর বাজারে জেনারালাইজড স্কিম অব প্রেফারেন্সেস প্লাস (জিএসপি প্লাস) সুবিধা পাওয়ার প্রস্তুতিও চলমান থাকবে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। তবে এফটিএ সম্পন্ন করা সম্ভব হলে জিএসপি প্লাস সুবিধার বিকল্প ব্যবহারের প্রয়োজন নাও হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, ‘তবে আশা করি জিএসপি প্লাসের অপশনটা আমাদের নিতে হবে না, তার আগেই আমরা এফটিএটা কমপ্লিট করব।’

বিনিয়োগ বাড়াতে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, সহজ ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া এবং বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছ আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মনে করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্য বিক্রির জন্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো এবং রপ্তানির ক্ষেত্রে বিদেশি বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা-দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যবসা শুরু করতে দীর্ঘ সময় লাগার বিষয়টি তুলে ধরে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ট্রেড লাইসেন্স, ব্যাংক হিসাব ও প্রাথমিক ছাড়পত্র সংগ্রহের পর আমদানি নিবন্ধন সনদ নেওয়া এবং যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলা পর্যন্ত গড়ে ৩৫৫ দিন সময় লেগে যায়। ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়ায় এত দীর্ঘসূত্রতা উদ্যোক্তাদের আগ্রহ ও উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করে। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে একক অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার।

মন্ত্রী জানান, প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা ও ফি পরিশোধ করে দেশ-বিদেশের যেকোনো স্থান থেকে ট্রেড লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা যাবে। সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাছে লাইসেন্সের ফি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পৌঁছে যাবে। এতে উদ্যোক্তাদের সময় ও ভোগান্তি কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া যৌথ মূলধনী কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) সেবা পুরোপুরি অনলাইনে নিয়ে আসা এবং বিভিন্ন লাইসেন্সের মেয়াদ তিন থেকে পাঁচ বছর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। বিভিন্ন সরকারি সংস্থার পৃথক পরিদর্শনের পরিবর্তে সমন্বিত পরিদর্শনব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। এসব সংস্কারের মাধ্যমে ২০২৭ সালের মধ্যে ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার ক্ষেত্রে লাইসেন্স এবং অনুমতি সংগ্রহের দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।

দেশে নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে জ্বালানি সংকটকে অন্যতম বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, জ্বালানি সরবরাহ বাড়াতে নতুন ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল স্থাপন এবং গ্যাসকূপ খননের কাজ চলছে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সহজ হবে বলে মনে করেন তিনি।

আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় কৌশলগত মজুত ও সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তাঁর মতে, এলএনজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুতব্যবস্থা না থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার প্রভাব বাংলাদেশে দ্রুত পড়ে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পণ্য ও জ্বালানির মজুত সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি।

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি, ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজ করা, জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ-এই বিষয়গুলোকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তাঁর মতে, এলডিসি উত্তরণকে টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুযোগে পরিণত করতে হলে এখন থেকেই কার্যকর প্রস্তুতি ও নীতিগত সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মোস্তফা আবিদ খান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব ও স্বাগত বক্তব্য দেন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি দৌলত আখতার মালা। সমাপনী বক্তব্য দেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মঈনুল হক।