জাতীয়
খুলনায় উৎসবমুখর পরিবেশ, নৌপথে মোংলার উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
খুলনার দাকোপ উপজেলার দুর্গম উপকূলীয় জনপদ নলিয়ানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমন ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকালে সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্ট ও সংলগ্ন এলাকা পরিদর্শন শেষে হেলিকপ্টারে নলিয়ানে পৌঁছান তিনি। পরে সেখান থেকে নৌপথে মোংলার উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর এই সফরকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান এবং উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়ন নিয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
সফরসূচি অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ২৮ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি দাকোপ উপজেলার নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অবতরণ করে। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে তিনি নলিয়ান কোস্টগার্ডের পন্টুনে যান। পরে সকাল ১০টা ৪৮ মিনিটে পন্টুন থেকে নৌপথে মোংলার উদ্দেশে যাত্রা করেন তিনি।
এ সময় নলিয়ান বাজার মোড়ে অপেক্ষমাণ শত শত মানুষের সঙ্গে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী। উপস্থিত কয়েকজনের সঙ্গে করমর্দনও করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখার জন্য সকাল থেকেই বাজার ও আশপাশের এলাকায় ভিড় জমান স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁর আগমনকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল এবং খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য আমির এজাজ খান। এ ছাড়া খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল্লাহ হারুন, জেলা প্রশাসক মিজ হুরে জান্নাতসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সফরে রয়েছেন।
দুর্গম উপকূলীয় জনপদ নলিয়ানের মানুষের কাছে প্রধানমন্ত্রীর এই সফর বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। নদীভাঙন, সুপেয় পানির সংকট, দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। এসব সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের বিষয়ে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ দেখতে চান স্থানীয় বাসিন্দারা।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে নলিয়ান ও আশপাশের এলাকায় জোরদার করা হয় নিরাপত্তাব্যবস্থা। নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠ এবং সংলগ্ন এলাকায় পুলিশ, প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট (পিজিআর), নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা যায়। প্রধানমন্ত্রীর হেলিকপ্টার অবতরণের স্থান নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে ডগ স্কোয়াডের মাধ্যমেও তল্লাশি চালানো হয়। পুরো সফর নির্বিঘ্ন করতে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন।
সফর উপলক্ষে নলিয়ান বাজারের পশ্চিম প্রান্তের পাকা সড়ক থেকে পূর্ব দিকে কোস্টগার্ড কার্যালয় পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার সড়কে ইট বিছিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর হেলিকপ্টার অবতরণের জন্য নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে প্রস্তুত করা হয় হেলিপ্যাড। সফরকে ঘিরে এসব প্রস্তুতির ফলে এলাকাটিতে বাড়তি তৎপরতা দেখা যায়।
সফরসূচি অনুযায়ী, নলিয়ান থেকে নৌপথে মোংলার নৌঘাঁটিতে যাওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সেখানে নির্ধারিত কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি মোংলা বন্দরের জেটি এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শনের কর্মসূচিও রয়েছে তাঁর। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে মোংলা বন্দরকেন্দ্রিক উন্নয়ন সম্ভাবনা ও দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এদিকে, সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় সম্ভাব্য ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল স্থাপনের স্থান পরিদর্শন নিয়েও আলোচনা রয়েছে। মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ, প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং সম্ভাব্য এলএনজি টার্মিনালকে ঘিরে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তাঁদের প্রত্যাশা, এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণাঞ্চলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
প্রাকৃতিক সম্পদ, নদী ও সমুদ্রকেন্দ্রিক বাণিজ্য এবং সুন্দরবনঘেঁষা ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। তবে এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে তাই একদিকে যেমন মানুষের মধ্যে উৎসাহ দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি উপকূলীয় জনপদের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপের প্রত্যাশাও বাড়ছে।