জাতীয়

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস আজ, দুর্ঘটনা রোধে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০১:০৮ পিএম

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস আজ, দুর্ঘটনা রোধে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব
ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস আজ। ‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে দেশব্যাপী দিবসটি পালিত হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনা কমানো, নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে দিবসটি পালন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তাকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা, পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠন, চালক, পথচারী ও সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

দিবসটি উপলক্ষে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ সড়ক নিরাপত্তা জোরদারে বিভিন্ন কর্মসূচি ও উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে পেশাদার গাড়িচালকদের স্বাস্থ্য, চক্ষু ও মাদক পরীক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং যুবসমাজকে সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা, সড়কের সাইন-সিগন্যাল ও রোড মার্কিং সংস্কার এবং দক্ষতার ভিত্তিতে পেশাদার চালকদের পুরস্কৃত করা। পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে প্রচার-প্রচারণা ও ম্যারাথন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ অনুসরণ করে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ গতি, নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী এবং দুর্ঘটনা-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনাও কমিয়ে আনা সম্ভব।

সড়ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষামূলকভাবে ১৪০ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়কে সেফটি ইমপ্রুভমেন্ট কার্যক্রম বাস্তবায়ন এবং প্রায় ৬০০ কিলোমিটার মহাসড়কে বিভিন্ন নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব উদ্যোগের আওতায় সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা এবং যান চলাচলকে আরও সুশৃঙ্খল করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

পেশাদার মোটরযান চালকদের দক্ষতা ও সচেতনতা বাড়াতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) মাধ্যমে ৬০ হাজার চালককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য হলো চালকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, ট্রাফিক আইন মেনে চলার প্রবণতা তৈরি এবং বেপরোয়া ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে যানবাহন চালানো নিরুৎসাহিত করা। একই সঙ্গে চালকদের দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

দুর্ঘটনার পর দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাও সড়ক নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ লক্ষ্যে স্বাস্থ্য খাতে ৪০টি বেসিক লাইফ সাপোর্ট অ্যাম্বুলেন্স ও ৪০টি মোটরসাইকেল অ্যাম্বুলেন্স সরবরাহ করা হয়েছে। দুর্ঘটনাস্থল থেকে আহত ব্যক্তিদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে এসব যান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি মহাসড়কে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, যান চলাচল পর্যবেক্ষণ এবং দুর্ঘটনা দ্রুত শনাক্ত করতে সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রমকে আরও কার্যকর, সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক করতে আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন, ২০২৬’ প্রণয়নের কার্যক্রম এবং একটি জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামোর মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, নীতিগত দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং কার্যক্রমের তদারকি জোরদার করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ ছাড়া মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমাতে স্ট্যান্ডার্ড হেলমেট এনফোর্সমেন্ট গাইডলাইন এবং যানবাহনের গতিসীমা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে স্পিড ম্যানেজমেন্ট ম্যানুয়াল প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীদের মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার, নির্ধারিত গতিসীমা মেনে চলা এবং ট্রাফিক আইন অনুসরণ নিশ্চিত করা গেলে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়া ও প্রাণহানির ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠায় শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন কিংবা আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আইনের যথাযথ প্রয়োগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা। চালকের বেপরোয়া গতি, ট্রাফিক আইন অমান্য, অদক্ষতা, যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং পথচারীদের অসচেতনতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। পাশাপাশি সড়কের নকশাগত ত্রুটি, পর্যাপ্ত সাইন-সিগন্যালের অভাব, ফুটপাত দখল এবং দুর্বল সড়ক ব্যবস্থাপনাও নিরাপদ যাতায়াতের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

এ পরিস্থিতিতে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নিয়মিত তদারকি, আইন প্রয়োগে ধারাবাহিকতা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি। চালকদের প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা, পথচারীদের জন্য নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা করা এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে সড়ক পরিকল্পনা, নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রতিটি পর্যায়ে নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন দেশবাসীকে ট্রাফিক আইন মেনে চলা, দায়িত্বশীলভাবে যানবাহন চালানো এবং নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠায় সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। লন্ডন থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এ আহ্বান জানান। নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠায় চালক, যাত্রী, পথচারী, পরিবহন মালিক-শ্রমিক এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সম্মিলিত দায়িত্ব পালনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

এদিকে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যানে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫ হাজার ৪৯০ জন। বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যানে এই ব্যবধান সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র নিরূপণ এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহের গুরুত্বকে সামনে নিয়ে এসেছে।

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের মূল লক্ষ্য শুধু একটি দিবস পালন নয়, বরং সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং মানুষের জীবন রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ। পরিকল্পিত সড়কব্যবস্থা, দক্ষ চালক, নিরাপদ যানবাহন, আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও জনসচেতনতা নিশ্চিত করা গেলে সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব। তাই নিরাপদ সড়ক গড়ে তুলতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিকের সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণ অপরিহার্য।