জাতীয়

আকিদার নামে ঐক্যে ফাটল ধরানো ভারতীয় ষড়যন্ত্র: কাজী ইব্রাহীম


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৯ পিএম

আকিদার নামে ঐক্যে ফাটল ধরানো ভারতীয় ষড়যন্ত্র: কাজী ইব্রাহীম
ছবি: সংগৃহীত

আকিদার দোহাই দিয়ে মুসলিম উম্মাহ, আলেম সমাজ ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেছেন বিশিষ্ট ইসলামি আলোচক মাওলানা কাজী মুহাম্মদ ইব্রাহীম। তাঁর দাবি, জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্য নষ্ট করার পেছনে ভারতীয় আধিপত্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্র থাকতে পারে। এ পরিস্থিতিতে বিভাজনের ফাঁদে পা না দিয়ে সমমনা ইসলামি দল ও আলেম সমাজকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

সম্প্রতি নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় এসব কথা বলেন মাওলানা কাজী মুহাম্মদ ইব্রাহীম। বক্তব্যে তিনি মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্ক, আকিদাগত মতপার্থক্য, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় ঐক্যের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

মুসলিম পরিচয় নিয়ে বিভেদ সৃষ্টির সমালোচনা

মাওলানা কাজী ইব্রাহীম বলেন, একজন ব্যক্তির মুসলিম পরিচয় ও পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসলামের মৌলিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কালেমা পাঠ, সালাত আদায় এবং কিবলামুখী হয়ে ইবাদত করার মতো মৌলিক বিষয়গুলোকে বিবেচনায় না নিয়ে সামান্য মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে একে অপরকে বিভ্রান্ত কিংবা ‘আকিদাগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ’ আখ্যা দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।

তিনি মনে করেন, এ ধরনের প্রবণতা মুসলমানদের মধ্যে দূরত্ব ও অবিশ্বাস তৈরি করছে। মতপার্থক্য থাকলেই কাউকে একঘরে করে ফেলা কিংবা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আকিদা নিয়ে ঢালাও অভিযোগ তোলা উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই পারস্পরিক বিরোধ বাড়ানোর পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে মতপার্থক্য নিরসন এবং বৃহত্তর স্বার্থে ঐক্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

রাজনীতি ও আকিদার পার্থক্য তুলে ধরলেন কাজী ইব্রাহীম

ইসলামি দলগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ টেনে কাজী ইব্রাহীম বলেন, রাজনীতি মূলত রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও পার্থিব ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে রাজনৈতিক কৌশল ও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মতপার্থক্য থাকলেও তা যেন দ্বীনের মৌলিক বিষয় নিয়ে বিরোধে রূপ না নেয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

নিজের বক্তব্যের সমর্থনে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর খোলাফায়ে রাশেদিনের নেতৃত্ব নির্ধারণের ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। তাঁর ব্যাখ্যায়, মুসলিম সমাজের নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্নে সাহাবায়ে কেরাম বাস্তব পরিস্থিতি এবং প্রশাসনিক প্রয়োজন বিবেচনায় বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। এসব ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে বর্তমান সময়েও রাজনৈতিক বাস্তবতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার গুরুত্ব অনুধাবন করা যায় বলে তিনি মনে করেন।

সূরা রুমের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের উদাহরণ

বক্তব্যে পবিত্র কোরআনের সূরা রুমের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও তুলে ধরেন এই ইসলামি আলোচক। তিনি রোমান ও পারসিক শক্তির মধ্যকার সংঘাতের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ধর্মীয় বিশ্বাসের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

কাজী ইব্রাহীমের বক্তব্যের মূল কথা হলো, বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও বৃহত্তর স্বার্থ ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় পারস্পরিক সহযোগিতার সুযোগ থাকতে পারে। তাঁর মতে, রাজনৈতিক মতভিন্নতা কিংবা আকিদাগত বিতর্ককে এমন পর্যায়ে নেওয়া উচিত নয়, যাতে মুসলমানদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বিভেদ তৈরি হয় এবং সম্মিলিত শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে ঐক্যের আহ্বান

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে কাজী ইব্রাহীম বলেন, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ দেশপ্রেমিক ও ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও ঐক্য থাকা জরুরি।

তাঁর মতে, জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে জাতীয় ঐক্যের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তা ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। তবে সেই পার্থক্যকে কেন্দ্র করে পারস্পরিক শত্রুতা, অবিশ্বাস ও বিভাজন বাড়লে তা দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ এবং জাতীয় স্বার্থের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তিনি মনে করেন, ইসলামি দল ও অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ানো এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমন্বিত অবস্থান নেওয়া সময়ের দাবি। বিশেষ করে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি।

বিভাজনের পেছনে দিল্লির ভূমিকার অভিযোগ

রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিভাজনের পেছনে ভারতীয় আধিপত্যবাদী শক্তির ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ করেন কাজী ইব্রাহীম। তাঁর দাবি, আকিদাগত মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে ইসলামি দল, আলেম সমাজ ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে বিরোধ উসকে দেওয়া হলে তার সুযোগ নিতে পারে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী শক্তিগুলো। তিনি এ ধরনের বিভাজনমূলক তৎপরতার নেপথ্যে দিল্লির ভূমিকা রয়েছে বলেও অভিযোগ তোলেন।

তবে তাঁর এই বক্তব্যকে একটি অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে; বক্তব্যে উত্থাপিত দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ এখানে উপস্থাপিত হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য বা অতিরিক্ত তথ্য পাওয়া গেলে অভিযোগটির বাস্তবতা আরও স্পষ্টভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।

আলেম সমাজকে সতর্ক থাকার আহ্বান

বক্তব্যের শেষাংশে আলেম সমাজ ও ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি বিশেষ আহ্বান জানান কাজী ইব্রাহীম। তিনি বলেন, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলা করা প্রয়োজন। মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ অনৈক্য, পারস্পরিক সংঘাত ও বিভাজন অতীতেও নানা ধরনের ক্ষতির কারণ হয়েছে। তাই পুরোনো ভুলের পুনরাবৃত্তি এড়াতে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীকে ঢালাওভাবে ‘গোমরাহ’ কিংবা আকিদাগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ আখ্যা দিয়ে দূরে সরিয়ে দেওয়ার প্রবণতা পরিহার করা উচিত। মতপার্থক্য থাকলে তা জ্ঞান, যুক্তি ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধকে ধর্মীয় বিভেদের রূপ দেওয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি।

কাজী ইব্রাহীমের মতে, দেশ ও উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং ঐক্যবদ্ধ অবস্থান বজায় রাখা জরুরি। তাঁর বক্তব্যে মূলত আকিদাগত মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে বিভাজন এড়িয়ে জাতীয় ঐক্য সংহত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।