রাজনীতি
আ.লীগ ও ভারতের সঙ্গে সমঝোতা করে দেশ চালাচ্ছে সরকার: নাহিদ
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, জ্বালানি খাতের সংকট এবং সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে আগামী ৩০ অক্টোবর রাজধানীতে গণবিক্ষোভের ডাক দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, আওয়ামী লীগ ও ভারতের সঙ্গে একধরনের সমঝোতার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করছে সরকার। একই সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনার বিদ্যমান কাঠামোর পরিবর্তন এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সিএ ভবনসংলগ্ন এলাকায় আয়োজিত এক সমাবেশ থেকে নাহিদ ইসলাম এই গণবিক্ষোভের ঘোষণা দেন। সমাবেশে এনসিপির নেতারা সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের সমালোচনা করেন এবং দাবি আদায়ে রাজপথে আন্দোলন জোরদার করার কথা জানান। আগামী ৩০ অক্টোবর বেলা ৩টায় রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে গণবিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে ঢাকাবাসীসহ সর্বস্তরের মানুষকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান দলটির সদস্যসচিব আখতার হোসেন।
এনসিপির ঘোষিত তিন দফা দাবির মধ্যে রয়েছে-আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং জ্বালানি খাতের সংকট মোকাবিলায় ব্যর্থতার অভিযোগে জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগ, একদলীয় সংবিধান সংশোধন কমিটি বিলুপ্ত করে গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং সাইবার আইনসহ সব কর্তৃত্ববাদী আইন বাতিল। এসব দাবি আদায়ে জনমত গড়ে তুলতে শুক্রবার থেকেই সপ্তাহব্যাপী গণসংযোগ কর্মসূচি শুরু করেছে দলটি। সমাবেশ শেষে কারওয়ান বাজার এলাকায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে লিফলেট বিতরণ করেন এনসিপির নেতাকর্মীরা।
সমাবেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারের সার্বিক ব্যর্থতার দায় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীর অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত। তাঁর অভিযোগ, গত সাত মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। জনগণের অধিকার রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখার পরিবর্তে তিনি সংবিধান নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন এনসিপির আহ্বায়ক। একই সঙ্গে সংবিধান সংশোধনের নামে জনগণের অধিকার খর্ব করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের দায়িত্বে থাকার নৈতিক অধিকার নেই বলেও মন্তব্য করেন নাহিদ ইসলাম। জ্বালানি খাতের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, গত সাত মাসে এই খাতের সংকট মোকাবিলায় সরকার কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিতে পারেনি। জ্বালানিমন্ত্রীকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয় না বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, মন্ত্রী নিজেও এখন এ বিষয়ে কথা বলছেন না। এমন পরিস্থিতিতে তাঁরও মন্ত্রিসভায় থাকার অধিকার নেই বলে মন্তব্য করেন এনসিপির আহ্বায়ক।
মন্ত্রিসভার আরও কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ থাকতে পারে উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, আপাতত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীকে সরিয়ে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন করা উচিত। তাঁর ভাষ্য, এর আগে তথ্যমন্ত্রীকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং কয়েক দিন আগে একজন প্রতিমন্ত্রীকেও দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে যাঁদের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে সবচেয়ে বেশি অবহেলার অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির রাজনৈতিক সমঝোতার অভিযোগ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও সরকারের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়ে বিভিন্ন খবর সামনে এসেছে। আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক নিজেদের দিকে টানতে নিরীহ মানুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, মামলা-বাণিজ্য এবং ব্ল্যাকমেলের মতো ঘটনা ঘটেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। নাহিদ ইসলামের দাবি, এখনো আওয়ামী লীগ ও ভারতের সঙ্গে একধরনের সমঝোতার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করা হচ্ছে। গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের বিষয়ে সরকারের অবস্থানও স্পষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্র পরিচালনার বিদ্যমান বন্দোবস্তে মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। শুধু সরকার কিংবা ব্যক্তির পরিবর্তনের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার বর্তমান ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। এ সময় তিনি দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সরকারের কার্যক্রমে জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
সমাবেশে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, অনেকে আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ালেও জনগণের অধিকার আদায় এবং সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনতে এনসিপি আবারও রাজপথে নেমেছে। গণ-অভ্যুত্থানের আগে যেভাবে তাঁরা মাঠে সক্রিয় ছিলেন, এবারও একইভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান তিনি। তাঁর অভিযোগ, বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা বা সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা যাবে না-এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে। তবে এনসিপি সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করার জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাবে বলে জানান তিনি।
এদিকে সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে রাজধানীবাসীসহ দেশের সর্বস্তরের মানুষকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। নেতারা জানান, ঘোষিত তিন দফা দাবি আদায়ে গণসংযোগের মাধ্যমে জনমত গঠন এবং ৩০ অক্টোবরের গণবিক্ষোভ কর্মসূচি সফল করতে দলীয় কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।