রাজনীতি
হেফাজতের নেতৃত্বে কওমি দলগুলোর ঐক্য হলে স্বাগত জানাবে জামায়াত
হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বে কওমি অঙ্গনভিত্তিক সাতটি ইসলামি দলকে নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য গঠনের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। প্রস্তাবিত এই ঐক্যে জামায়াতকে অন্তর্ভুক্ত না করা হলেও ইসলামি দলগুলো সম্মিলিতভাবে কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুললে তাকে স্বাগত জানানো হবে বলে জানিয়েছে দলটি।
বিবিসি বাংলার এক বিশেষ প্রতিবেদনে দেশের ইসলামি দলগুলোর মধ্যে নতুন করে ঐক্যপ্রক্রিয়া, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জামায়াতে ইসলামীসহ ১১টি দলকে নিয়ে গঠিত নির্বাচনি ঐক্য একটি স্থায়ী রাজনৈতিক জোটে রূপ নিয়েছে। এরই মধ্যে হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বে কওমি অঙ্গনের সাতটি ইসলামি দলকে নিয়ে পৃথক একটি ঐক্য গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। এই উদ্যোগে জামায়াতের সঙ্গে আগে নির্বাচনি ঐক্যে থাকা দুটি দল অংশ নিলেও নতুন প্রস্তাবিত প্ল্যাটফর্মে জামায়াতে ইসলামীকে রাখা হয়নি।
হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশীরুল্লাহ জানিয়েছেন, কওমি অঙ্গনের স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রাখতেই সাতটি দলকে নিয়ে এই ঐক্যের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী কিংবা আওয়ামী লীগ-কোনো রাজনৈতিক দলের বলয়ে না গিয়ে স্বতন্ত্র অবস্থান থেকে কাজ করতে চান তারা।
জামায়াতে ইসলামীকে এই ঐক্যপ্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত না করার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মুফতি বশীরুল্লাহ দাবি করেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদাগত অবস্থানের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর মতাদর্শের পার্থক্য রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি মূলত ধর্মীয় বিশ্বাস ও আদর্শের সঙ্গে সম্পর্কিত; এটি কোনো রাজনৈতিক বিরোধের বিষয় নয়।
তবে হেফাজতের এই অবস্থানের বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী জানিয়েছে, অন্যান্য ইসলামি দলের সঙ্গে আকিদাগত বিতর্ক নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন নয়। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জোবায়ের বিবিসি বাংলাকে বলেন, আকিদা নিয়ে তাদের কোনো দুশ্চিন্তা নেই এবং এ বিষয়ে জামায়াতের অবস্থান পরিষ্কার। ইসলামি দলগুলোর বিরুদ্ধে জামায়াত কখনো কথা বলে না এবং তাদের সমালোচনারও পাল্টা জবাব দেয় না বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এহসানুল মাহবুব জোবায়ের আরও বলেন, জামায়াতে ইসলামী জনগণের সঙ্গে থেকে কাজ করার চেষ্টা করছে। অন্য ইসলামি দলগুলো যদি নিজেদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলে কিংবা কোনো প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে, তাহলে জামায়াত সেই উদ্যোগকে স্বাগত জানাবে। অর্থাৎ, প্রস্তাবিত ঐক্যে জামায়াত সরাসরি অংশ না নিলেও ইসলামি দলগুলোর পারস্পরিক ঐক্যের উদ্যোগের বিরোধিতা করছে না দলটি।
এদিকে সাতটি ইসলামি দলকে নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য গঠনের উদ্যোগের মধ্যেই দলগুলোর লক্ষ্য, কর্মপদ্ধতি ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কেমন হবে, তা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, সাতটি দল এক হওয়ার পরও যদি কোনো দল বিএনপি কিংবা জামায়াতে ইসলামীর দিকে তাকিয়ে থাকে, তাহলে সেই ঐক্য থেকে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। তার মতে, কার্যকর ও অর্থবহ ঐক্য গড়ে তুলতে হলে অন্য রাজনৈতিক বলয়গুলোর প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসে স্বতন্ত্র অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালউদ্দীন আহমদ এ বিষয়ে ভিন্নমত তুলে ধরেছেন। তিনি মনে করেন, ধর্মীয় ও জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে ইসলামি দলগুলো এক ব্যানারে আন্দোলন করতে পারে। তবে রাজনৈতিক জোট গঠন কিংবা নির্বাচনকেন্দ্রিক সমঝোতার ক্ষেত্রে প্রতিটি দলের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা থাকা উচিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণের দিক থেকে নতুন এই উদ্যোগ দেশের ইসলামি দলগুলোর মধ্যে পৃথক রাজনৈতিক অবস্থান ও পারস্পরিক সহযোগিতার সম্ভাবনাকে সামনে নিয়ে এসেছে। তবে প্রস্তাবিত সাত দলীয় ঐক্য শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে, দলগুলো অভিন্ন কর্মসূচিতে একমত হতে পারবে কি না এবং রাজনৈতিক জোটের বিষয়ে তাদের অবস্থান কী হবে-তা নির্ভর করছে পরবর্তী আলোচনা ও সিদ্ধান্তের ওপর।