সারাদেশ
তাজমিন হত্যা: দারোয়ানের বক্তব্যে সামনে এলো চাঞ্চল্যকর নতুন তথ্য
কুমিল্লায় স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিন হত্যা মামলায় বাসার গেট বন্ধ থাকা নিয়ে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। এর আগে তাজমিনের কথিত প্রেমিক রাজু দাবি করেছিলেন, বাসার গেট বন্ধ থাকায় তিনি সেখানে যাননি। তবে ওই বাসার দারোয়ান বাছিরের বক্তব্য, রাত ১টার পর গেট বন্ধ করে দেওয়া হলেও তাজমিনের মা বাবার কাছে গেটের চাবি ছিল। চাবি না পেলেও তাজমিনকে ডাক দেওয়ার সুযোগ ছিল বলে জানান তিনি।
দারোয়ান বাছির বলেন, তিনি গেটের পাশেই থাকেন এবং সেখানে একটি জানালাও রয়েছে। গত আট বছরে ওই বাসায় কোনো খারাপ কিছু দেখেননি বলেও দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, পরিবারের সবাই ভালো মানুষ। তাজমিনের সেখানে আসার সম্ভাবনা নেই।
বাছির আরও বলেন, রাত ১টার পর গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তবে গেট বন্ধ থাকলেও তাজমিনের মা বাবার কাছে চাবি ছিল। চাবি নিতে না পারলেও তাকে ডাকতে পারতেন তারা। তাজমিন এলে গাড়ির শব্দও তার কানে আসত বলে দাবি করেন দারোয়ান।
এদিকে, ঘটনার তদন্তের স্বার্থে গোয়েন্দা পুলিশ বাসার সিসিটিভি ক্যামেরা জব্দ করে নিয়ে গেছে বলে জানান বাছির। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে তাকে নিষেধ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
গত ১৪ অক্টোবর তাজমিন হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক পবিত্র সরকার কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে একটি অধিযাচনপত্র পাঠান। এতে রাজুকে গ্রেপ্তার করে হস্তান্তরের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
অধিযাচনপত্রে বলা হয়, তাজমিনের ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরের কললিস্ট ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে ঘটনার আনুমানিক দুই দিন আগে কক্সবাজার সদর থানা এলাকায় তার অবস্থানের তথ্য পাওয়া গেছে। এ সময় রাজুর সঙ্গে তার দেখা সাক্ষাৎ এবং ঘটনার আগে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের তথ্যও পাওয়া যায়।
তাজমিনের সঙ্গে রাজুর পূর্বপরিচয় ও সম্পর্কের ধরন, যোগাযোগের কারণ, ডিজিটাল মাধ্যমে তাদের কথোপকথন এবং হত্যা মামলার বিষয়ে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য রয়েছে কি না, তা জানতে রাজুকে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন বলে অধিযাচনপত্রে উল্লেখ করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
পুলিশ জানায়, সোমবার ১৪ অক্টোবর দুপুরে কুমিল্লা গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল রাজুকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা পর বিকেল ৫টার দিকে তাকে কক্সবাজার সদর মডেল থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে ফেরত দেওয়া হয়। এরপর গোয়েন্দা পুলিশের দলটি থানা ত্যাগ করে।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান এশিয়া পোস্টকে বলেন, কুমিল্লার পুলিশ রাজুকে নিয়ে যায়নি। কিছু বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন ছিল। হোটেল সংক্রান্ত কিছু বিষয়ও যাচাই করার দরকার ছিল। সেসব যাচাই করে তাকে আবার কক্সবাজার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
তাজমিনের মা বাবা রাজুর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দিতে চাইলে কক্সবাজার জেলা পুলিশের কাছে দিতে পারবেন বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে, কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অহিদুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, অধিযাচনপত্রের ভিত্তিতে রাজুকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। তবে কুমিল্লা গোয়েন্দা পুলিশ তাকে আবার ফেরত দেওয়ায় কক্সবাজার সদর মডেল থানা পুলিশ তাকে আদালতে সোপর্দ করেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও হোটেলকর্মীদের তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় তাজমিনকে নিয়ে কক্সবাজার শহরের কলাতলী এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে ওঠেন রাজু। হোটেলের নিবন্ধন খাতায় তাজমিনের নাম লেখা হয় তানজু আক্তার এবং বয়স উল্লেখ করা হয় ১৮ বছর। সেখানে তাকে রাজুর স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়। রাজুর পরিচয়ে লেখা হয়, তিনি বান্দরবানের লামা এলাকার মনির আহমদের ছেলে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হোটেলের এক কর্মচারী জানান, পরদিন ৭ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে তারা হোটেল ছেড়ে চলে যান। হোটেলের নিবন্ধন খাতায় রাজুর দুটি মুঠোফোন নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর লেখা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজেও তাদের একসঙ্গে বের হতে দেখা গেছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে তাজমিন কক্সবাজারে আসেন। পরে কুমিল্লায় ফেরার জন্য রাজুই তাকে আইকনিক এক্সপ্রেসের বাসের টিকিট কেটে দেন। কুমিল্লায় পৌঁছে বাস থেকে নেমে বাড়ি যাওয়ার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠেন তাজমিন।
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর এক বান্ধবীকে হাতঘড়ি দেওয়া নিয়ে মায়ের সঙ্গে ঝগড়ার পর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান তাজমিন। প্রথমে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক বান্ধবীর কাছে যান। পরে রাজুর সঙ্গে যোগাযোগ করে কক্সবাজারে যান।
এর আগে গত ৮ অক্টোবর লালমাই উপজেলার কুমিল্লা নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কসংলগ্ন পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগতপুর মানুমুড়া এলাকার একটি ধানক্ষেত থেকে জান্নাতুল তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক মো. সুমনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।