সারাদেশ
কোনো শিক্ষার্থী পায়নি সাত কলেজ, বাকি ৭১টিতেও তীব্র সংকট
উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজকে জেলার সবচেয়ে ভালো বিদ্যাপিঠ হিসেবে ধরা হয়। ওই কলেজের বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা— এই তিন বিভাগ মিলে কলেজটিতে মোট ১২০০ শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারেন। এ বছর তিনধাপে ভর্তির আবেদন শেষে কলেজটিতে ব্যবসায় শিক্ষায় ৫০, মানবিকে ছয়, বিজ্ঞানে একটি আসন খালি রয়েছে। তবে ভিন্ন চিত্র জেলার ৭৮টি কলেজের।
প্রতিটি কলেজের ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখা গেছে, মোট সাতটি কলেজ ভর্তির জন্য কোনো শিক্ষার্থীই পায়নি। বেশি কিছু কলেজে এক, দু’জন করে শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য বিবেচিত হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষের মধ্যেও এক ধরনের হতাশা কাজ করছে। শিক্ষার্থী না থাকা ও সংকটের কারণে ভাবমূর্তি নষ্টের পাশাপাশি এমপিওভুক্ত কলেজগুলো সরকারি সুবিধা বঞ্চিত হয়ে ঝুঁকির মধ্যে পড়ার আশঙ্কাও করা হচ্ছে।
জানা গেছে, মূলত আসন সংখ্যার তুলনায় এবারের এসএসসিতে কম সংখ্যক পরীক্ষা পাশ করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এসএসসিতে পাশের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ আসন রয়েছে জেলার ওই কলেজগুলোতে। এ ছাড়া অনেকে জেলার বাইরে ভালো কলেজে সুযোগ পেয়ে যাওয়ার কারণে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী সংকট আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে।
৪৫০ আসনের বিপরীতে শিক্ষার্থী না পাওয়া জেলার নবীনগর উপজেলার কৃষ্ণনগর আব্দুল জব্বার স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. মনির হোসেনের সঙ্গে এ নিয়ে মোবাইল ফোনে কথা হয়।
অনেকটা আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে আমাদের কিছু করার থাকে না। এখন তো সব অনলাইনে। সবাই নিজেদের মতো করে কলেজ বাছাই করে আবেদন করলে সে অনুযায়ী ভর্তি হয়। আমরা এখনো শিক্ষার্থী পাইনি। যদি আবার ভর্তির কোনো সুযোগ দেয়, তাহলে হয়তো পাওয়া যেতে পারে।
কলেজগুলোর ওয়েবসাইট ঘেঁটে পাওয়া তথ্য অনুসারে, শিক্ষার্থী না পাওয়া কলেজগুলোর মধ্যে রয়েছে নবীনগর উপজেলার চারটি, জেলা সদরের দু’টি ও বাঞ্ছারামপুর উপজেলার একটি। শিক্ষার্থী না পাওয়া নবীনগরের কলেজগুলো হলো, সাতগাঁও আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কৃষ্ণনগর আব্দুল জব্বার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, জিনোদপুর ইউনিয়ন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও রাবেয়া মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ। শিক্ষার্থী পায়নি জেলা সদরের ব্রাহ্মণবাড়িয়া সেন্ট্রাল কলেজ ও সাদেকপুর ইউনিয়ন স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং বাঞ্ছারামপুর উপজেলার উলুকান্দি কলেজ।
এদিকে সরাইল উপজেলার তিতাস মডেল কলেজ ৪৫০ আসনের বিপরীতে শুধুমাত্র মানবিক বিভাগে একজন শিক্ষার্থী পেয়েছে। বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ক্যাপ্টেন এ বি তাজুল ইসলাম কলেজে ৪৫০ আসনের বিপরীতে শিক্ষার্থী পেয়েছে মাত্র ১৩ জন। এর মধ্যে বিজ্ঞানের কোনো শিক্ষার্থী নেই। আশুগঞ্জের বগৈর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সমসংখ্যক আসনের বিপরীতে ব্যবসায় শিক্ষায় একজন, মানবিকে ১৬ জন শিক্ষার্থী পাওয়া গেছে। এ কলেজেও বিজ্ঞানে কোনো শিক্ষার্থী পাওয়া যায়নি। বিজয়নগরের কবি সানাউল হক কলেজে তিন বিভাগে ৪৫০ জনের বিপরীতে মাত্র ৩০ জন শিক্ষার্থী পাওয়া গেছে। সমসংখ্যক আসনের বিপরীতে জেলা সদরের অন্বেষা বিদ্যাপিঠে মাত্র চারজন শিক্ষার্থীর আবেদন ওয়েবসাইটে দেখা গেছে। নাসিরনগর উপজেলার বিজয়লক্ষী স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুই বিভাগের ৩০০ আসনের বিপরীতে শুধু মানবিকে ২৮ জনের ভর্তি আবেদন রয়েছে। কসবার সিরাজুল হক স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৪৫০ আসনের বিপরীতে তিন বিভাগে মাত্র ২৬ জন ভর্তির আবেদন করেছেন। আখাউড়া উপজেলার ছতুরা চান্দপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজে দুই বিভাগে ৩০০ আসনের বিপরীতে আবেদন জমা হয়েছে মাত্র ২০ জনের। একই উপজেলার জাহানার হক কলেজে ৬০০ আসনের বিপরীতে তিন বিভাগে ৪১ জন ভর্তির জন্য বিবেচিত হয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলায় ৭৮টি কলেজে ভর্তিযোগ্য আসন আছে ৪১ হাজার ৮৪০। তবে এ বছর জেলায় এসএসসি পরীক্ষায় পাস করেছে ২০ হাজার ২২২ জন। পাস করাদের মধ্যে অনেকে আবার জেলার বাইরের ভালো কলেজেও ভর্তির আবেদন করেছে এবং সুযোগ পেয়েছেন। যে কারণে জেলার কলেজগুলোতে শিক্ষার্থী সংকট দেখা দেয়।
২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিতে প্রথম ধাপের ফল ২০ আগস্ট রাতে ভর্তিবিষয়ক ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। কাঙ্ক্ষিত কলেজ পাওয়া শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যে নির্ধারিত ফি দিয়ে ভর্তি নিশ্চিত করেছেন। দ্বিতীয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের অনলাইন আবেদন ২৫ আগস্ট শেষ হয়। এই ধাপের ফলাফল প্রকাশ করা হয় ২৮ আগস্ট। এরপর আবার ৩১ আগস্ট ও আগামী ১ সেপ্টেম্বর তৃতীয় পর্যায়ে আবেদন করা হয়। এভাবে বাছাই প্রক্রিয়া শেষ করে ৭ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ভর্তির কাজ শেষ করা হবে। তারপর ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে একাদশ শ্রেণিতে ক্লাশ শুরু হওয়ার কথা।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এসএসসি, দাখিল ও ভোকেশনাল থেকে মোট ২৯ হাজার ১২২ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। পাস করেছে ২০ হাজার ২২২ জন। অকৃতকার্য হয়েছে আট হাজার ৯০০ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে এক হাজার ৬১১। পাসের হর ৬৯ দশমিক ৪৪। দাখিলে পাসের হার ৭০ দশমিক ৩৭ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯৮ জন। আর ভোকেশনালে পাসের হার ৭০ দশমিক ৪৪ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪০ জন। গত বছরের তুলনায় এবার জেলায় পাসের হার ও জিপিএ-৫-উভয় কমেছে। গত বছর পাসের হার ছিল ৮০ দশমিক ৪৪ শতাংশ। আর জিপিএ-৫ পেয়েছিল এক হাজার ৭১৪ জন।