সারাদেশ

ছয় ফুটের ব্যবধান, সম্প্রীতির বন্ধন: লালমনিরহাটে পাশাপাশি মসজিদ-মন্দির


সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:২৮ পিএম

ছয় ফুটের ব্যবধান, সম্প্রীতির বন্ধন: লালমনিরহাটে পাশাপাশি মসজিদ-মন্দির
ছবি: সংগৃহীত

একদিকে কাঁসর-ঘণ্টা, ঢাকের বাদ্য আর উলুধ্বনি, অন্যদিকে ভেসে আসে আজানের সুমধুর ধ্বনি। মাঝখানে দূরত্ব মাত্র ছয় ফুট। নেই কোনো বিভাজনের দেয়াল, নেই ধর্মীয় ভিন্নতাকে কেন্দ্র করে দূরত্ব তৈরির প্রবণতা। একই আঙিনায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে মসজিদ ও মন্দির। লালমনিরহাট জেলা শহরের কালীবাড়ি এলাকায় অবস্থিত পুরান বাজার জামে মসজিদ ও কালীবাড়ি কেন্দ্রীয় মন্দির দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই বহন করে চলেছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ধর্মীয় সহনশীলতার অনন্য দৃষ্টান্ত।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৩১ সালে কালীবাড়ি এলাকায় প্রথম মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে আশপাশের মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের ধর্মীয় প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে হিন্দু সম্প্রদায়ের সম্মতিতে একই আঙিনায় নির্মাণ করা হয় মসজিদ। এরপর থেকে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পাশাপাশি চলছে দুই ধর্মের মানুষের প্রার্থনা ও উপাসনা। ধর্মীয় বিশ্বাস আলাদা হলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার মাধ্যমে গড়ে উঠেছে এখানকার মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির দৃঢ় বন্ধন।

এ দুই উপাসনালয়ের সহাবস্থানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো একে অপরের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন। প্রতিদিন মসজিদে আজান শুরু হলে মন্দিরের ঢাক-ঢোল, কাঁসর-ঘণ্টাসহ সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র বাজানো এবং মাইকের ব্যবহার বন্ধ রাখা হয়। মসজিদে জামাত শেষ হলে আবার শুরু হয় মন্দিরের পূজা-অর্চনা। দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক সমঝোতা ও শ্রদ্ধার ভিত্তিতে চলে আসছে এই রীতি।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই এ এলাকায় সম্প্রীতির এমন চর্চা চলে আসছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক সহযোগিতা। বিশেষ করে শারদীয় দুর্গাপূজা, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার মতো উৎসবগুলোতে এ সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

দুর্গাপূজার সময় নামাজের বিরতিতে মন্দিরের স্বেচ্ছাসেবকেরা বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। অন্যদিকে ঈদের দিন নামাজ শেষে মুসলিম সম্প্রদায়ের অনেকেই মন্দিরে গিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হলেও উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি, সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে তাঁরা সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

এলাকার প্রবীণ বাসিন্দাদের ভাষ্য, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মসজিদ ও মন্দিরের এমন সহাবস্থান দেখে আসছেন তাঁরা। তাঁদের মতে, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতা কখনোই এখানকার মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ।

কালীবাড়ি কেন্দ্রীয় মন্দিরের ভক্ত বাবু কিশোর চন্দ্র বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষেরা শিখিয়ে গেছেন, অন্যের বিশ্বাসকে কীভাবে সম্মান করতে হয়। আজানের ধ্বনি কানে আসামাত্রই আমাদের ঢাকিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাদ্যযন্ত্র বাজানো বন্ধ করে দেন। এটি এখন আমাদের বিশ্বাসের অংশ হয়ে গেছে।’

পুরান বাজার জামে মসজিদের পরিচালনা কমিটির সদস্য আমজাদ হোসেন বলেন, ‘আমরা যুগ যুগ ধরে অত্যন্ত শান্তিতে পাশাপাশি ইবাদত করে আসছি। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা এবং অন্যের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর একটি সুন্দর উদাহরণ এই আঙিনা।’

মসজিদ ও মন্দিরের এমন ব্যতিক্রমী সহাবস্থান দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকেও দর্শনার্থীরা আসেন। স্থানীয়দের কাছে জায়গাটি শুধু দুটি ধর্মের উপাসনালয় নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতীক। তাঁদের মতে, ধর্মীয় সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য বড় কোনো আয়োজনের চেয়ে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মানবোধ ও সহমর্মিতা থাকা বেশি জরুরি-যার বাস্তব উদাহরণ এই কালীবাড়ি এলাকা।

এদিকে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাতে মসজিদ ও মন্দির প্রাঙ্গণ পরিদর্শন করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। এ সময় তিনি দুই ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সম্প্রীতির চর্চার প্রশংসা করেন।

মন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান বিশ্বে যখন নানা স্থানে অস্থিরতা দৃশ্যমান, তখন লালমনিরহাটের এই যৌথ আঙিনা সমগ্র পৃথিবীর সামনে শান্তি, সামাজিক সৌহার্দ্য ও অসাম্প্রদায়িকতার এক উজ্জ্বল ও চিরন্তন বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে।’

ধর্মীয় বিশ্বাস ও উপাসনার ধরন আলাদা হলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং সহযোগিতার মধ্য দিয়ে লালমনিরহাটের এই মসজিদ-মন্দির প্রাঙ্গণ হয়ে উঠেছে অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন। মাত্র ছয় ফুটের ব্যবধান যেন মনে করিয়ে দেয়-মানুষের মধ্যে ভালোবাসা ও সম্মান থাকলে ধর্মের ভিন্নতা কখনোই বিভেদের দেয়াল হয়ে উঠতে পারে না।