সারাদেশ

রোগমুক্তির আশায় ডুমুর গাছের নির্গত তরল সংগ্রহে মানুষের ভিড়


সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:১৯ পিএম

রোগমুক্তির আশায় ডুমুর গাছের নির্গত তরল সংগ্রহে মানুষের ভিড়
ছবি: সংগৃহীত

নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার একটি ডুমুর গাছ থেকে নির্গত ঘন তরল পদার্থকে রোগ নিরাময়ের উপাদান মনে করে তা সংগ্রহ করতে ভিড় করছেন আশপাশের গ্রামের মানুষ। কেউ হাঁড়ি, কেউ জগ, আবার কেউ গ্লাস হাতে অপেক্ষা করছেন গাছের নিচে। প্রায় সাত দিন ধরে মাধনগর ইউনিয়নের বাঁশিলা উত্তরপাড়া গ্রামের সেফাত আলীর বাড়ির একটি ডুমুর গাছকে ঘিরে চলছে এই তৎপরতা। স্থানীয়দের কেউ কেউ ওই তরল পানও করছেন। তবে গাছ থেকে নির্গত এই পদার্থ পান করলে বিভিন্ন রোগ ভালো হয় কি না, তার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কিছুদিন আগে বাড়ির ডুমুর গাছের ডাল কাটছিলেন সেফাত আলী। এ সময় গাছের অন্যান্য কাটা ডাল থেকে আঠার মতো পদার্থ বের হলেও একটি ডাল থেকে তুলনামূলক ঘন তরল বের হতে দেখা যায়। বিষয়টি দেখে কৌতূহলবশত তিনি একটি পাত্রে সেই তরল সংগ্রহ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পদার্থটি সাধারণ গাছের কষের তুলনায় অনেকটা পানির মতো, তবে বেশ ঘন।

পরে সেফাত আলী ওই তরল তাঁর অসুস্থ ও বয়স্ক বাবাকে পান করান। তাঁর দাবি, এটি পান করার পর বাবার শারীরিক ব্যথা কমতে শুরু করে। এরপর বিষয়টি তিনি গ্রামের অন্যদের জানান। ধীরে ধীরে ঘটনাটি আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। সেই থেকে গাছটির নির্গত তরল সংগ্রহ করতে সেফাত আলীর বাড়িতে আসতে শুরু করেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ।

স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত ধারণা, ডুমুর গাছ থেকে বের হওয়া এই তরল পান করলে বিভিন্ন রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে। এমন বিশ্বাস থেকেই অনেকে পাত্র নিয়ে সেখানে ভিড় করছেন। গাছের নির্দিষ্ট একটি ডালে পাত্র বেঁধে রেখে দিন-রাত তরল সংগ্রহ করা হচ্ছে। তবে কয়েকজনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা দাবি দিয়ে কোনো পদার্থের রোগ নিরাময়ের ক্ষমতা নিশ্চিত করা যায় না।

ডুমুর গাছের ঔষধি গুণ নিয়ে লোকজ চিকিৎসায় দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের ধারণা প্রচলিত রয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডুমুরের একাধিক প্রজাতি দেখা যায়। এসব গাছের ফল, পাতা ও ছাল ঐতিহ্যগতভাবে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে গাছের প্রজাতি, ব্যবহৃত অংশ, প্রস্তুতপ্রণালি ও গ্রহণের মাত্রার ওপর এর প্রভাব নির্ভর করতে পারে।

বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ডুমুরের কিছু প্রজাতির ফল, পাতা ও ছালে জৈব-সক্রিয় উপাদানের উপস্থিতি এবং সম্ভাব্য ঔষধি কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কিছু গবেষণায় ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, হজমে সহায়তা, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করা এবং প্রদাহ কমানোর ক্ষেত্রে ডুমুরের নির্যাসের সম্ভাবনা নিয়ে পরীক্ষা চালানো হয়েছে। তবে এসব গবেষণার ফলাফল থেকে সরাসরি গাছের ডাল কেটে বের হওয়া তরল পান করলে একই উপকার পাওয়া যাবে-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। এ বিষয়ে আরও নির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ প্রয়োজন।

লোকজ চিকিৎসায় ডুমুর গাছের কষ বা দুধের মতো সাদা তরল বিভিন্ন চর্মরোগে ব্যবহারের কথাও প্রচলিত রয়েছে। তবে গাছের কষের রাসায়নিক উপাদান, সম্ভাব্য বিষক্রিয়া এবং ত্বক বা শরীরের ওপর এর প্রভাব প্রজাতিভেদে ভিন্ন হতে পারে। তাই কোনো গাছ থেকে নির্গত তরলকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া নিরাপদ বা রোগের ওষুধ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, সেফাত আলীর বাড়ির উঠানে ডুমুর গাছের একটি ডাল থেকে সাদা, দুধের মতো ঘন তরল বের হচ্ছে। সেটি সংগ্রহের জন্য ডালের সঙ্গে পাত্র বেঁধে রাখা হয়েছে। বিভিন্ন বয়সী মানুষ সেখানে ভিড় করছেন। তাঁদের কেউ পাত্রে তরল সংগ্রহ করছেন, আবার কেউ গ্লাসে করে তা পান করছেন। গাছ থেকে নির্গত এই পদার্থকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে কৌতূহল ও নানা ধরনের আলোচনা তৈরি হয়েছে।

নাটোর সদর উপজেলার ভাটোদাঁড়া গ্রামের কাঠ ব্যবসায়ী ইয়াকুব আলী মৃধা বলেন, ডুমুর গাছ কাটলে এ ধরনের তরল বের হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। তাঁর দাবি, ডুমুর গাছের ফল ও ছাল থেকেও সাদা আঠার মতো পদার্থ পাওয়া যায়, যা বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। তবে তাঁর এই বক্তব্য ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও প্রচলিত ধারণার ভিত্তিতে দেওয়া; এর মাধ্যমে নির্গত তরলটির রোগ নিরাময়ের ক্ষমতা প্রমাণিত হয় না।

রাজশাহী কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহমুদা জানান, গাছ থেকে নির্গত পদার্থকে সাধারণভাবে আঠা বা কষ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এর রং ও ঘনত্বে কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে। ডুমুর গাছের বিভিন্ন অংশে ঔষধি গুণসম্পন্ন উপাদান থাকতে পারে এবং সেগুলোর ব্যবহার নিয়ে গবেষণাও রয়েছে। তবে গাছ থেকে নির্গত এই তরল পান করলে রোগমুক্তি হয়-এমন দাবির বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। এ ধরনের প্রচারণা বা গুজবে বিশ্বাস না করে বিষয়টি বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করার আহ্বান জানান তিনি।

নলডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. জুনায়েদ আহমেদ লেলিন বলেন, গ্রামের কিছু মানুষ গাছ থেকে নির্গত তরলকে রোগ নিরাময়ের উপাদান মনে করে পান করছেন বলে তিনি জানতে পেরেছেন। তবে এ বিষয়ে তাঁর কাছে কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বা প্রমাণ নেই। ঘটনাটি নিয়ে অতিরঞ্জিত প্রচারণা ছড়ালে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, ডুমুর গাছের কোনো কোনো অংশে ঔষধি উপাদান থাকতে পারে, কিন্তু সে কারণে গাছ থেকে নির্গত যেকোনো তরলকে রোগের ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা নিরাপদ নয়। তরলটির প্রকৃতি ও উপাদান শনাক্ত না করে তা পান করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই রোগ নিরাময়ের আশায় এমন পদার্থ পান না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।