স্বাস্থ্য
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বাজেটের বরাদ্দ বাড়ানোর আহ্বান
বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। দেশে বছরে প্রায় ৫ লাখ ৭১ হাজার মানুষের মৃত্যুর পেছনে উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ভূমিকা রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধির পাশাপাশি বর্ধিত বরাদ্দের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করার আহ্বান জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, এ খাতে পরিকল্পিত ও টেকসই অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে উচ্চ রক্তচাপজনিত হৃদরোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি এবং অকালমৃত্যু কমানো সম্ভব।
রোববার রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) ভবনে আয়োজিত এক সাংবাদিক কর্মশালায় এ আহ্বান জানানো হয়। ‘বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে টেকসই অর্থায়ন: অগ্রগতি, বাধা এবং করণীয়’ শীর্ষক এ কর্মশালার আয়োজন করে গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান)। এতে সহযোগিতা করে গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই)।
কর্মশালায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে-২০২৫’-এর তথ্যে দেশের শীর্ষ ১০টি রোগের তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে উচ্চ রক্তচাপ। এ তথ্য উচ্চ রক্তচাপের ক্রমবর্ধমান জনস্বাস্থ্যগত প্রভাব এবং রোগটি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
কর্মশালায় আরও জানানো হয়, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে হৃদরোগে প্রায় ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এসব মৃত্যুর ৫২ শতাংশের জন্য উচ্চ রক্তচাপ দায়ী বলে উল্লেখ করা হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চ রক্তচাপ সময়মতো শনাক্ত করা, নিয়মিত রক্তচাপ পরিমাপ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের মৃত্যুর ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
উদ্বেগের আরেকটি বিষয় হলো, তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যেও উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ বাড়ছে। ‘বাংলাদেশ এনসিডি স্টেপস সার্ভে, ২০১৮’-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর প্রায় ১২ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। সাধারণত উচ্চ রক্তচাপকে বয়স্কদের স্বাস্থ্যসমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এ পরিসংখ্যান তরুণদের মধ্যেও রোগটি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
কর্মশালায় বক্তারা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে টেকসই অর্থায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁদের মতে, শুধু স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; বরং বরাদ্দের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি। বিশেষ করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় রক্তচাপ পরিমাপের সুযোগ সম্প্রসারণ, রোগ শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় ওষুধের সহজলভ্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন।
তাঁরা মনে করেন, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিক সরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে রোগটির জটিলতা কমানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়ের চাপও কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার অভ্যাস গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের। এতে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে অর্থায়নের বর্তমান অবস্থা, বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনা তুলে ধরেন প্রজ্ঞার প্রোগ্রাম অফিসার সামিহা বিনতে কামাল।
কর্মশালায় আলোচনার মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বাজেটের কার্যকর ব্যবহার, টেকসই অর্থায়ন এবং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, সমন্বিত উদ্যোগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপজনিত অসুস্থতা ও মৃত্যুর হার কমিয়ে দেশের জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন সম্ভব।