লাইফস্টাইল
থ্রিফট শপিং: তরুণদের এক নতুন ফ্যাশন সংস্কৃতি
নতুন জামা মানেই যে শোরুম বা বড় বাজারে গিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করতে হবে, তা এখন আর নয়। দেশের তরুণরা (বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার) ধীরে ধীরে তৈরি করে নিয়েছে ভিন্ন এক ফ্যাশন-যার নাম ‘থ্রিফট শপিং’। এক সময় যেটাকে ব্যবহৃত জামা বলে অবহেলা করা হতো, সেটিই এখন হয়ে উঠছে ট্রেন্ডি ও টেকসই ফ্যাশনের এক অন্যতম প্রতীক।
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা টিকটকে চোখ রাখলেই দেখা যায় অসংখ্য পেজ ও কনটেন্ট, যেখানে থ্রিফটেড পোশাক দিয়েই সাজানো হচ্ছে নতুন ফ্যাশন স্টাইল। ছবির নিচে লেখা থাকে-‘কম দামেই ইউনিক ও নতুন লুক’। এই ভিজ্যুয়াল কনটেন্টগুলো তরুণদের আকৃষ্ট করছে সবচেয়ে বেশি।
এই নতুন ফ্যাশন কালচারের জনপ্রিয়তার অনেক কারণ রয়েছে। প্রথম কারণই হলো এর দাম। মাত্র কয়েকশ টাকাতেই পাওয়া যাচ্ছে বিদেশি ব্র্যান্ডের পোশাক। দ্বিতীয়ত,এর বৈচিত্র্য। একই পোশাক অন্য কারও সঙ্গে মিলে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম, ফলে আলাদা করে নজর কাড়ার সুযোগ থাকে। আরেকটি বড় কারণ হলো পরিবেশ সচেতনতা। বিশ্বজুড়ে এখন ‘সাস্টেইনেবল ফ্যাশন’ নিয়ে আলোচনার ঝড়। ব্যবহারযোগ্য পোশাক পুনরায় ব্যবহার মানে অপচয় কমানো এবং পৃথিবীর প্রতি দায়বদ্ধ থাকা। তরুণ প্রজন্মও সেই ভাবনায় শামিল হচ্ছে থ্রিফট শপিংয়ের মাধ্যমে।যা সমাজের জন্য নিয়ে এসেছে একটি সুন্দর নতুন ধারা।
তবে শুধু অনলাইন পেজ নয়, ঢাকায় এখন নিয়মিত থ্রিফট সেল ইভেন্টও হচ্ছে। কোনো ক্যাফে বা স্টুডিও ভাড়া করে সেখানে কয়েক ঘণ্টার জন্য থ্রিফট শপ বসানো হয়। বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে কেনাকাটা—এ যেন পুরোটা এক ধরনের দৃষ্টিনন্দন সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা। এক সময় যে থ্রিফট শপকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হতো, আজ সেটি বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি আর সেলফির নতুন অজুহাত যেন।
অবশ্য সমস্যাও আছে। সব পোশাকের মান এক নয়, কখনো সাইজ মেলে না, কখনো ছবির সঙ্গে বাস্তবের পার্থক্য দেখা যায়। অনলাইনে অর্ডার দিয়ে অনেকেই প্রতারিত হওয়ার অভিজ্ঞতার কথাও শোনান। কিন্তু তারপরও এই শপিং কালচার ক্রমেই বাড়ছে। কারণ, তরুণরা এটিকে শুধু কেনাকাটার মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং সামাজিক পরিচয়ের অংশ হিসেবেই দেখছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও থ্রিফট শপিং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অনেক তরুণ উদ্যোক্তা এখন খুব কম পুঁজি নিয়ে এ ব্যবসা শুরু করছে। এতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে—প্যাকেজিং, ডেলিভারি থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং পর্যন্ত। বড় আকারে বিকশিত হলে থ্রিফট শপ দেশের টেক্সটাইল খাতের সঙ্গে সমন্বয় করে সেকেন্ডারি মার্কেট তৈরি করতে পারে ধারণা করা হয়। বিদেশ থেকে ওভারস্টকড পোশাক এনে যদি সঠিকভাবে বাজারজাত করা যায়, তাহলে রাজস্ব আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি হবে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা। থ্রিফট শপিং মানেই ‘ব্যবহৃত জামা’—এই ভ্রান্ত ধারণা ভাঙতে শুরু করেছে তরুণরাই। এখন তারা প্রমাণ করছে, কম দামে কেনা পোশাকও হতে পারে আভিজাত্যের প্রতীক, যদি সেটা নিজের মতো করে ক্যারি করা যায়।
সত্যি বলতে থ্রিফট শপিং শুধু অর্থ সাশ্রয় নয় বরং এটি একটি টেকসই জীবনযাত্রার প্রতিফলনও। সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্টের মাধ্যমে এই কালচার ইতিমধ্যেই নিজের জায়গা করে নিয়েছে আমাদের মাঝে এবং এর গ্রহণযোগ্যতাও অনেকাংশে বেড়েছে।তাই ভবিষ্যতে যদি মান নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবসায়িক কাঠামো আরও সুসংগঠিত করা যায় তাহলে বাংলাদেশে থ্রিফট শপিং, ফ্যাশনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নেও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।
লেখক: মারুফা জাহান মুমু
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি