লাইফস্টাইল

পোষা বিড়ালের খাবারেই বিষ! গবেষণায় মিলল ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ানো উপাদান


লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২৩ পিএম

পোষা বিড়ালের খাবারেই বিষ! গবেষণায় মিলল ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ানো উপাদান
ছবি: সংগৃহীত

পোষা বিড়ালের জন্য বাজার থেকে কেনা খাবারেই মিলেছে সিসা, পারদ, আর্সেনিক ও ক্যাডমিয়ামের মতো ক্ষতিকর ভারী ধাতু। একই সঙ্গে এসব খাবারে পাওয়া গেছে আগাছানাশক ও প্লাস্টিক তৈরিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক, যার কয়েকটি ক্যানসারসহ গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। দেশটির ভোক্তা পণ্য পরীক্ষাকারী অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ‘ক্লিন লেবেল প্রজেক্ট’-এর সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে এসব তথ্য।

গবেষণায় ৬২টি ব্র্যান্ডের ১০০টির বেশি পণ্যের ১২২টিরও বেশি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা গেছে, শুকনো, ভেজা কিংবা হিমায়িত পদ্ধতিতে শুকানো সব ধরনের বিড়ালের খাবারেই ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি রয়েছে। এমনকি প্রাকৃতিক ও উচ্চ পুষ্টিগুণসম্পন্ন হিসেবে বাজারজাত করা খাবারও এসব উপাদান থেকে মুক্ত নয়।

গবেষণাটির প্রধান লেখক ও প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক মলি হ্যামিল্টন বলেন, অধিকাংশ বিড়াল প্রতিদিন প্রায় একই ধরনের খাবার খায়। ফলে এসব ক্ষতিকর উপাদান ধীরে ধীরে তাদের শরীরে জমা হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, বয়স্ক বিড়ালের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ। শরীর থেকে ভারী ধাতু ছেঁকে বের করার ক্ষেত্রে কিডনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অধিকাংশ নমুনায় মিলেছে বিষাক্ত ভারী ধাতু

গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, পরীক্ষিত নমুনার ৯৯ শতাংশে সিসা, ৯৬ শতাংশে ক্যাডমিয়াম এবং ৯৪ শতাংশে আর্সেনিক পাওয়া গেছে।

শুকনো বিড়ালের খাবারে সিসার পরিমাণ ভেজা খাবারের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। মানুষের শরীরে সিসার কোনো মাত্রাকেই নিরাপদ বলে বিবেচনা করা হয় না। ছোট প্রাণীর শরীরেও এই বিষাক্ত ধাতু মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।

ক্যাডমিয়াম ক্যানসার সৃষ্টি, কিডনির ক্ষতি ও হাড় দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যদিকে সিসা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করতে পারে।

সামুদ্রিক মাছের খাবারে বেশি পারদ

গবেষণায় দেখা গেছে, খাবারের প্রোটিনের উৎস অনুযায়ী বিষাক্ত উপাদানের মাত্রায় পার্থক্য রয়েছে। মাছ ও সামুদ্রিক খাবার দিয়ে তৈরি বিড়ালের খাবারে পারদ ও ক্যাডমিয়ামের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি।

অন্যান্য প্রোটিনযুক্ত খাবারের তুলনায় সামুদ্রিক মাছের খাবারে পারদের মাত্রা প্রায় ১৮ গুণ এবং ক্যাডমিয়ামের মাত্রা ২ দশমিক ৫ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। সামুদ্রিক মাছের ভেজা খাবারে পারদের পরিমাণ সাধারণ মুরগির মাংসের ভেজা খাবারের তুলনায় প্রায় ২৮ গুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে।

অন্যদিকে মুরগির মাংস দিয়ে তৈরি খাবারে পারদ ও ক্যাডমিয়ামের মাত্রা তুলনামূলক কম হলেও সিসা ও আগাছানাশক রাসায়নিকের উপস্থিতি বেশি দেখা গেছে।

মলি হ্যামিল্টনের ভাষ্য, মুরগির মাংসের খাবারে পারদ কম থাকলেও সিসা ও আগাছানাশকের পরিমাণ বেশি। ফলে কোন বিষাক্ত উপাদান এড়িয়ে চলবেন, তা বেছে নেওয়া কঠিন।

প্রতিষ্ঠানটির পরিচ্ছন্নতার মানদণ্ডে মুরগিভিত্তিক খাবারের প্রায় ৮৫ শতাংশ উত্তীর্ণ হয়েছে। বিপরীতে সামুদ্রিক মাছভিত্তিক খাবারের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ।

৩৭ শতাংশ খাবারে ক্যানসারের ঝুঁকিসংশ্লিষ্ট আগাছানাশক

বিড়ালের খাবারে ভিটামিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যোগ করতে বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ উপাদান ব্যবহার করেন প্রস্তুতকারকেরা। তবে এসব উপাদানের মাধ্যমে খাবারে ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রবেশ করতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

পরীক্ষায় ৩৭ শতাংশ বিড়ালের খাবারে গ্লাইফোসেট নামের আগাছানাশক পাওয়া গেছে। খাবারের উপাদান তালিকার প্রথম দিকে উদ্ভিজ্জ উপাদানের পরিমাণ যত বেশি ছিল, গ্লাইফোসেটের উপস্থিতিও তত বেশি দেখা গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ক্যানসারবিষয়ক গবেষণা সংস্থা গ্লাইফোসেটকে মানুষের জন্য সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে।

এ ছাড়া অর্ধেকের বেশি নমুনায় ডিইএইচপি নামের এক ধরনের প্লাস্টিক প্রস্তুতকরণে ব্যবহৃত রাসায়নিক পাওয়া গেছে। এটি ক্যানসার ও জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষ করে কৌটা ও প্যাকেটজাত বিড়ালের খাবারে এর উপস্থিতি বেশি।

খাবার নির্বাচনে মালিকদের পরামর্শ

যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা নিরাপত্তা সংস্থা ‘টক্সিক ফ্রি ফিউচার’-এর বিজ্ঞান বিভাগের পরিচালক রায়েন বাবাদি গবেষণাটিকে সুপরিচালিত বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, পোষা প্রাণীর খাবার ও মোড়ক থেকে ক্ষতিকর রাসায়নিক দূর করতে বিক্রেতাদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।

তবে বিড়ালের খাবার প্রস্তুতকারকদের সংগঠন ‘পেট ফুড ইনস্টিটিউট’-এর প্রধান নির্বাহী এলিস ফেনিগ দাবি করেছেন, প্রস্তুতকারকেরা কঠোর খাদ্য নিরাপত্তা ও মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনুসরণ করেন। তার ভাষ্য, বিড়ালের মালিকেরা পোষা প্রাণীর খাবারের নিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।

ক্লিন লেবেল প্রজেক্ট জানিয়েছে, পরীক্ষার জন্য প্রতিটি পণ্য বাজার থেকে সরাসরি কেনা হয়েছিল। ফলে কোনো ব্র্যান্ড গবেষণার নমুনা নির্বাচন বা পরীক্ষার ফলাফলে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পায়নি।

এ পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বিড়ালের খাবার নির্বাচনে কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।

প্রথমত, প্রতিদিন একই ধরনের খাবার না দিয়ে মাছ, মুরগি ও অন্যান্য উপযুক্ত প্রোটিনের মধ্যে বৈচিত্র্য রাখতে হবে। এতে নির্দিষ্ট কোনো উৎস থেকে ক্ষতিকর উপাদান গ্রহণের পরিমাণ কমতে পারে।

দ্বিতীয়ত, খাবারের মোড়কে থাকা উপাদানের তালিকা ভালোভাবে পড়তে হবে। পণ্যের নামে মাছের উল্লেখ না থাকলেও এর ভেতরে সামুদ্রিক মাছের উপাদান থাকতে পারে।

তৃতীয়ত, তালিকার প্রথম উপাদান দেখেই খাবারের নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে না। কারণ, মাছের কলিজা, অন্ত্র বা মাথার মতো অংশেও ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি থাকতে পারে।

সবশেষে, পছন্দের খাবার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান নিয়মিত রাসায়নিক ও নিরাপত্তা পরীক্ষা করে কি না, তা সরাসরি জেনে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

সূত্র: সিএনএন