লাইফস্টাইল

প্রতিদিন ৬ ঘণ্টা ঘুম কি যথেষ্ট? কম ঘুমে নীরবে বাড়তে পারে যেসব স্বাস্থ্যঝুঁকি


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:০৮ পিএম

প্রতিদিন ৬ ঘণ্টা ঘুম কি যথেষ্ট? কম ঘুমে নীরবে বাড়তে পারে যেসব স্বাস্থ্যঝুঁকি
ছবি: সংগৃহীত

ঘুমকে অনেকেই শুধু শরীরের বিশ্রামের সময় হিসেবে দেখেন। কিন্তু বাস্তবে ঘুমের মধ্যেই মস্তিষ্ক ও শরীরের নানা গুরুত্বপূর্ণ পুনরুদ্ধারমূলক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। দিনের ব্যস্ততা, কাজের চাপ ও মানসিক ক্লান্তির পর পর্যাপ্ত ঘুম শরীরকে পুনরুজ্জীবিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তারপরও অনেক প্রাপ্তবয়স্ক নিয়মিত ছয় ঘণ্টা ঘুমিয়েই মনে করেন, তাঁরা এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন এবং স্বাভাবিকভাবেই দৈনন্দিন কাজ করতে পারছেন। তবে প্রশ্ন হলো-প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা ঘুম কি সত্যিই শরীরের জন্য যথেষ্ট?

বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ অনুযায়ী, বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য নিয়মিত অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (CDC) ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন সাত ঘণ্টা বা তার বেশি ঘুমানোর পরামর্শ দেয়। ৬১ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের জন্য সাত থেকে নয় ঘণ্টা এবং ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের জন্য প্রতিদিন সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমের সুপারিশ করা হয়। ফলে নিয়মিত ছয় ঘণ্টা ঘুম বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য প্রয়োজনীয় ঘুমের তুলনায় কম।

বয়স অনুযায়ী কত ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন?

বয়স বাড়ার সঙ্গে মানুষের ঘুমের প্রয়োজনীয়তাও পরিবর্তিত হয়। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি ঘুম প্রয়োজন হয়। CDC-এর সুপারিশ অনুযায়ী, নবজাতক থেকে তিন মাস বয়সী শিশুর প্রতিদিন ১৪ থেকে ১৭ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। চার থেকে ১২ মাস বয়সীদের ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা, এক থেকে দুই বছর বয়সীদের ১১ থেকে ১৪ ঘণ্টা এবং তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সীদের ১০ থেকে ১৩ ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন।

ছয় থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের প্রতিদিন ৯ থেকে ১২ ঘণ্টা এবং ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের অন্তত সাত ঘণ্টা, ৬১ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের সাত থেকে নয় ঘণ্টা এবং ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমের পরামর্শ দেওয়া হয়।

ছয় ঘণ্টা ঘুমিয়েও কেন অনেকের ক্লান্তি লাগে না?

প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা ঘুমানোর পরও অনেক মানুষ মনে করতে পারেন যে তাঁদের শরীর ঠিকঠাক চলছে এবং কাজ করতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। এর একটি কারণ হতে পারে দীর্ঘদিনের অভ্যাস। নিয়মিত কম ঘুমালে একজন ব্যক্তি ঘুমের ঘাটতির সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যেতে পারেন এবং নিজের কর্মক্ষমতায় পরিবর্তন সব সময় স্পষ্টভাবে বুঝতে নাও পারেন। অর্থাৎ, ক্লান্তি খুব বেশি অনুভূত না হওয়া মানেই শরীরের প্রয়োজনীয় ঘুম সম্পূর্ণ হয়েছে-এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

অবশ্য খুব অল্পসংখ্যক মানুষের মধ্যে এমন জিনগত বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে, যার কারণে তাঁরা স্বাভাবিকভাবেই তুলনামূলক কম ঘুমিয়েও ভালোভাবে দৈনন্দিন কাজ করতে পারেন। তবে স্বাভাবিকভাবে কম ঘুম প্রয়োজন হয়-এমন মানুষ অত্যন্ত বিরল। তাই বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে নিয়মিত ছয় ঘণ্টা ঘুমকে পর্যাপ্ত ধরে নেওয়া উচিত নয়।

নিয়মিত ছয় ঘণ্টা ঘুমালে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে?

এক-দুই দিন কম ঘুমানোর প্রভাব এবং দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত কম ঘুমানোর প্রভাব এক নয়। দীর্ঘ সময় ধরে প্রয়োজনের তুলনায় কম ঘুম হলে শরীর ও মস্তিষ্কের ওপর বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। নিয়মিত সাত ঘণ্টার কম ঘুমকে অপর্যাপ্ত ঘুম হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি অপর্যাপ্ত ঘুমের সঙ্গে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ওজন বৃদ্ধি ও স্থূলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এর সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের মতো বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার সম্পর্কও পাওয়া গেছে। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে এবং বিষণ্নতা ও মেজাজের পরিবর্তনের মতো সমস্যার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।

শুধু শারীরিক স্বাস্থ্য নয়, ঘুমের ঘাটতি দৈনন্দিন কর্মক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যেতে পারে, স্মৃতি ও শেখার ক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতাও ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে মেজাজের পরিবর্তন, বিরক্তি ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ওপর প্রভাব পড়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ঘুমঘুম ভাবের কারণে গাড়ি চালানো বা অন্য কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়তে পারে।

শুধু ঘুমের সময় নয়, ঘুমের মানও গুরুত্বপূর্ণ

স্বাস্থ্যকর ঘুমের ক্ষেত্রে শুধু কত ঘণ্টা ঘুমানো হচ্ছে, সেটিই একমাত্র বিষয় নয়। ঘুমের মানও গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত সময় বিছানায় থাকার পরও যদি বারবার ঘুম ভেঙে যায়, ঘুমাতে দীর্ঘ সময় লাগে কিংবা সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরও সতেজ অনুভূত না হয়, তাহলে ঘুমের গুণগত মান ভালো নাও হতে পারে।

নিয়মিত সময়ে ঘুমানো ও জাগা, পর্যাপ্ত সময় ঘুমানো এবং রাতে নিরবচ্ছিন্নভাবে ঘুমাতে পারা-এসবই স্বাস্থ্যকর ঘুমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই কেউ সাত বা আট ঘণ্টা বিছানায় থাকলেও যদি ঘুম বারবার ভেঙে যায়, তাহলে শুধু সময়ের হিসাব দিয়ে ঘুমকে সম্পূর্ণ পর্যাপ্ত বলা যায় না।

তাহলে প্রতিদিন কত ঘণ্টা ঘুমানো উচিত?

বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য প্রতিদিন অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুমকে লক্ষ্য হিসেবে রাখা ভালো। নিয়মিত ছয় ঘণ্টা ঘুমিয়ে শরীর স্বাভাবিক মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটিকে অভ্যাসে পরিণত না করাই ভালো। ব্যক্তিভেদে ঘুমের প্রয়োজন কিছুটা ভিন্ন হতে পারে, তবে বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে সাত ঘণ্টা বা তার বেশি ঘুম স্বাস্থ্যকর ঘুমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

নিয়মিত পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর পরও যদি অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব, দিনের বেলায় অস্বাভাবিক ক্লান্তি, ঘন ঘন ঘুম ভেঙে যাওয়া বা দীর্ঘদিন ধরে ঘুমের সমস্যা থাকে, তাহলে বিষয়টি অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ কখনো কখনো এসব সমস্যার পেছনে ঘুমের কোনো ব্যাধি বা অন্য শারীরিক কারণও থাকতে পারে।

সব মিলিয়ে, ‘ছয় ঘণ্টা ঘুমেই অভ্যস্ত হয়ে গেছি’-এমন অনুভূতি থাকলেই সেটিকে পর্যাপ্ত ঘুমের প্রমাণ হিসেবে ধরা যায় না। শরীর ও মস্তিষ্কের সুস্থতার জন্য বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্কের নিয়মিত অন্তত সাত ঘণ্টা মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত করার চেষ্টা করা উচিত।