জাতীয়
জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় সহনশীল অর্থনীতি গড়ার তাগিদ পরিবেশমন্ত্রীর
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করে দেশের অর্থনীতিকে আরও সহনশীল ও টেকসই করে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। তিনি বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; বরং দেশের অর্থনীতি, কৃষি, শিল্প ও জনজীবনের জন্য এটি একটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, বন্যা, অনাবৃষ্টি ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে উৎপাদনশীলতা কমছে এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জলবায়ু সহনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলা, আগাম প্রস্তুতি নিশ্চিত করা এবং অভিযোজন ও দুর্যোগ মোকাবিলার কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে ‘গ্রিন ডায়ালগ: জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন পরিবেশমন্ত্রী।
মন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাতে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে কারখানার শ্রমিকদের কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা কমছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে কৃষিজমি ও সুপেয় পানির ওপর চাপ বাড়ছে। অন্যদিকে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি ও বন্যার কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামোর ক্ষতি হচ্ছে। এর ফলে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হলে রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শ্লথগতি, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা এবং জ্বালানি খাতের চাপসহ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বিশ্বব্যাংকের হালনাগাদ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। যদিও এটি চূড়ান্ত হিসাব নয়, তবু বর্তমান পরিস্থিতি অর্থনীতির সহনশীলতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাকে স্পষ্ট করে তুলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কার্যক্রম প্রণয়নের সময় জলবায়ু ঝুঁকিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
কৃষি খাতের গুরুত্ব তুলে ধরে পরিবেশমন্ত্রী বলেন, দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য হ্রাস, বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কৃষি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশে সেচব্যবস্থার উন্নয়ন হলেও কৃষি উৎপাদন এখনো অনেকাংশে আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। ফলে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির মতো জলবায়ুজনিত পরিবর্তন কৃষির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। এসব ঝুঁকি কমাতে সময়োপযোগী অভিযোজন কৌশল গ্রহণ, কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও যথাযথ প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও কার্যকর অভিযোজনের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা যায়। বন্যার কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কিংবা শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে অবকাঠামো নির্মাণ, উৎপাদনব্যবস্থা পরিচালনা এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করা জরুরি।
পরিবেশমন্ত্রী বলেন, টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলাকে উন্নয়ন পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি, দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদার এবং ক্ষয়ক্ষতি কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব। জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন।
আলোচনা অনুষ্ঠানে সরকারের নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, শিল্পোদ্যোক্তা, পরিবেশ ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চার শতাধিক প্রতিনিধি অংশ নেন। অনুষ্ঠানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, অর্থনৈতিক কাঠামোর পুনর্বিন্যাস এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।