ধর্ম

বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ধর্মমত ইসলাম


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০২ পিএম

বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ধর্মমত ইসলাম
ছবি: সংগৃহীত

ইসলাম বিশ্বের অন্যতম প্রধান ও প্রভাবশালী ধর্ম। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে এই ধর্মের প্রচার শুরু হওয়ার পর থেকে দীর্ঘ ১৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শ। তাওহিদ, রিসালাত ও আখেরাতের বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই ধর্মের প্রচার-প্রসারে রয়েছে ত্যাগ, নির্যাতন, ধৈর্য ও সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস।

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ৪০ বছর বয়সে নবুয়ত লাভ করেন। এরপর তিনি আল্লাহর দেওয়া দায়িত্ব পালনে মনোনিবেশ করেন এবং মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদত করার আহ্বান জানান। ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি গোপনে দাওয়াত দেওয়ার পর প্রকাশ্যে ধর্মের বাণী প্রচার শুরু করেন। তাঁর প্রথম দাওয়াতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল মক্কার সাফা পাহাড়ে কুরাইশদের উদ্দেশে দেওয়া ঐতিহাসিক আহ্বান।

তৎকালীন আরব সমাজে কোনো বিপদ বা শত্রুর আক্রমণের আশঙ্কা দেখা দিলে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে মানুষকে সতর্ক করার প্রচলন ছিল। সেই রীতি অনুসরণ করে মহানবী (সা.) একদিন সাফা পাহাড়ে উঠে কুরাইশদের বিভিন্ন গোত্রকে সমবেত করেন। উপস্থিত লোকজনকে তিনি প্রশ্ন করেন, পাহাড়ের অপর পাশে শত্রুবাহিনী অপেক্ষা করছে বলে জানালে তাঁরা তাঁকে বিশ্বাস করবেন কি না। উত্তরে সমবেত লোকজন জানান, তাঁরা তাঁকে বিশ্বাস করবেন, কারণ তাঁর কাছ থেকে কখনো মিথ্যা শোনেননি।

এরপর মহানবী (সা.) তাঁদের আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপন এবং পরকালীন শাস্তি থেকে বাঁচার আহ্বান জানান। তিনি নিজের নিকটাত্মীয়দেরও সতর্ক করেন, যাতে তাঁরা নিজেদের পরকালীন মুক্তির জন্য সৎকর্ম করেন এবং আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলেন। তাঁর এই আহ্বান ছিল ইসলামের প্রকাশ্য দাওয়াতের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

তবে মহানবী (সা.)-এর এই আহ্বান সবাই ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেননি। তাঁর চাচা আবু লাহাব প্রকাশ্যেই বিরোধিতা করেন এবং তাঁকে অপমানজনক কথা বলেন। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, এর পরিপ্রেক্ষিতে সুরা লাহাব নাজিল হয়, যেখানে আবু লাহাবের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে।

প্রকাশ্য দাওয়াত ও কুরাইশদের বিরোধিতা

সাফা পাহাড়ে আহ্বানের পর মহানবী (সা.) মক্কার বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে হজের মৌসুমে আগত মানুষের কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছে দিতে থাকেন। তাঁর মূল আহ্বান ছিল—আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মানুষকে তাঁরই ইবাদত করতে হবে। কিন্তু মক্কার প্রভাবশালী কুরাইশ নেতাদের একটি অংশ এই দাওয়াতের বিরোধিতা শুরু করে।

তৎকালীন মক্কায় কাবাঘরকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্বের পাশাপাশি বাণিজ্যিক প্রভাবও গড়ে উঠেছিল। বহু দেব-দেবীর উপাসনা এবং প্রচলিত ধর্মীয় রীতিনীতির সঙ্গে এই ব্যবস্থার সম্পর্ক ছিল। ফলে এক আল্লাহর ইবাদতের আহ্বান তাঁদের প্রচলিত বিশ্বাস ও সামাজিক অবস্থানের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

মহানবী (সা.)-এর দাওয়াতের বিরোধিতা করতে গিয়ে মুশরিক নেতারা তাঁকে কখনো কবি, কখনো জাদুগ্রস্ত ব্যক্তি বলে অপবাদ দিতেন। কোরআনের বাণীকে তাঁরা প্রাচীনকালের কাহিনি বলেও প্রচার করতেন। নবুয়তের প্রমাণ দাবি করা, কিয়ামত নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং বিভিন্ন অলৌকিক নিদর্শন দেখানোর দাবি জানানোও তাঁদের বিরোধিতার অংশ ছিল।

অন্যদিকে, মূর্তিপূজার সমর্থকেরা যুক্তি দিতেন, তাঁদের উপাস্যরা আল্লাহর কাছে সুপারিশ করতে পারবে। ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের বিশ্বাসের পরিবর্তে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত ও তাঁর ওপর নির্ভরশীলতার শিক্ষা দেওয়া হয়। এভাবেই ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরোধের পাশাপাশি সামাজিক নেতৃত্ব ও প্রচলিত ব্যবস্থাকে ঘিরেও সংঘাত বাড়তে থাকে।

নির্যাতন, অপমান ও কঠিন পরীক্ষার দিনগুলো

মহানবী (সা.)-এর দাওয়াত যত ছড়িয়ে পড়তে থাকে, তাঁর বিরোধীরাও তত বেশি কঠোর হয়ে ওঠে। ইসলামের প্রাথমিক অনুসারীদের অনেকেই নির্যাতন, অপমান ও সামাজিক নিপীড়নের শিকার হন। মুসলমানদের নামাজ আদায়ে বাধা দেওয়া, কোরআন তিলাওয়াতের সময় বিদ্রূপ করা এবং মহানবী (সা.)-কে বিভিন্নভাবে কষ্ট দেওয়ার ঘটনা ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।

বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়, মক্কার বিরোধীরা মহানবী (সা.)-এর চলার পথে কাঁটা বিছিয়ে দিতেন এবং নামাজের সময় তাঁকে অপমান করার চেষ্টা করতেন। এমনকি একবার সেজদারত অবস্থায় তাঁর পিঠের ওপর উটের নাড়িভুঁড়ি ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ইসলামী ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে। এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি ধৈর্য ধরে আল্লাহর বাণী প্রচার অব্যাহত রাখেন।

তাঁর অনুসারীদের ওপর নির্যাতন চালানো হলেও ইসলামের প্রচার থেমে থাকেনি। বরং ত্যাগ, ধৈর্য ও বিশ্বাসের মাধ্যমে প্রাথমিক মুসলিম সমাজ ধীরে ধীরে আরও সুসংগঠিত হয়ে ওঠে। ইসলামের ইতিহাসে এই সময়কে ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি অবিচল থাকার এক কঠিন অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তায়েফ সফর ও নতুন আশ্রয়ের সন্ধান

মক্কায় বিরোধিতা ও নির্যাতন তীব্র হয়ে উঠলে মহানবী (সা.) ইসলামের বাণী প্রচারের উদ্দেশ্যে তায়েফ সফর করেন। কিন্তু সেখানেও তিনি প্রত্যাশিত সাড়া পাননি। ইসলামী ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, তায়েফের লোকজন তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে এবং তাঁর প্রতি দুর্ব্যবহার করে। এই ঘটনা তাঁর জীবনের অন্যতম বেদনাদায়ক অধ্যায় হিসেবে পরিচিত।

এত প্রতিকূলতার পরও তিনি দাওয়াতের কাজ থেকে সরে দাঁড়াননি। বরং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে মানুষের কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। পরবর্তী সময়ে মদিনার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমর্থনের ভিত্তিতে মুসলমানদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যায়।

হিজরত ও মদিনায় ইসলামী সমাজের বিকাশ

মক্কায় মুসলমানদের ওপর নির্যাতন বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে মহানবী (সা.) সাহাবিদের পর্যায়ক্রমে মদিনায় হিজরত করার অনুমতি দেন। পরে তিনিও মদিনায় হিজরত করেন। ইসলামের ইতিহাসে এই হিজরত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। হিজরতের মধ্য দিয়ে মুসলমানরা এমন একটি পরিবেশ লাভ করেন, যেখানে তাঁরা আরও সংগঠিতভাবে ধর্মীয় ও সামাজিক জীবন পরিচালনা করতে সক্ষম হন।

মদিনায় মহানবী (সা.) মুসলিম সমাজকে সুসংগঠিত করেন। সেখানে ধর্মীয় শিক্ষা, সামাজিক দায়িত্ব, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সামষ্টিক জীবনের বিভিন্ন দিক বিকশিত হয়। মদিনা পর্বে ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং একটি সংগঠিত ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রদায় হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

পরবর্তী সময়ে ইসলামের বিস্তার আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বাণিজ্য, ধর্মপ্রচার, অভিবাসন, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের ইসলাম গ্রহণের মধ্য দিয়ে এ ধর্ম বিশ্বের বিস্তৃত ভূখণ্ডে পৌঁছে যায়।

বিশ্বব্যাপী ইসলামের বিস্তার

মহানবী (সা.)-এর মৃত্যুর পরও ইসলামের বিস্তার অব্যাহত থাকে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে উত্তর আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া এবং পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিকাশ ঘটে। বণিক, ধর্মপ্রচারক, পণ্ডিত এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক যোগাযোগের মাধ্যমে বহু অঞ্চলে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলা অঞ্চলসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় ইসলাম বিস্তারের পেছনে সুফি সাধক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, বাণিজ্যিক যোগাযোগ ও সামাজিক পরিবর্তনের ভূমিকা ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম সমাজে শিক্ষা, সাহিত্য, স্থাপত্য, দর্শন, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির বিভিন্ন ধারাও বিকশিত হয়।

বর্তমানে বিশ্বের বহু দেশে মুসলমানরা বসবাস করেন। তাঁদের ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক রীতিনীতি ভিন্ন হলেও ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস তাঁদের একটি বৃহৎ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত করেছে। জনসংখ্যা, ভৌগোলিক বিস্তার এবং বিশ্বব্যাপী সামাজিক-সাংস্কৃতিক উপস্থিতির কারণে ইসলাম সমসাময়িক বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ধর্ম হিসেবে বিবেচিত।

ত্যাগ ও সংগ্রাম থেকে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি

ইসলামের ইতিহাসের সূচনালগ্ন ছিল নানা প্রতিকূলতা ও পরীক্ষায় পূর্ণ। সাফা পাহাড়ে প্রকাশ্য আহ্বান, কুরাইশদের বিরোধিতা, মক্কায় নির্যাতন, তায়েফ সফরের বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা এবং মদিনায় হিজরত-প্রতিটি ঘটনা ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

ইসলামের অনুসারীদের কাছে এসব ঘটনা বিশ্বাস, ধৈর্য, আত্মত্যাগ ও নৈতিক দৃঢ়তার শিক্ষা বহন করে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রচারিত ধর্মের বাণী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে ইসলাম বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ভিত্তি এবং বৈশ্বিক ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

দীর্ঘ ঐতিহাসিক পথচলায় ইসলাম যে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি ও প্রভাব অর্জন করেছে, তার পেছনে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি মানুষের জীবনযাপন, সামাজিক সম্পর্ক, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের বহুমাত্রিক ভূমিকা।