অর্থনীতি

বাজার ও মূল্যস্ফীতির চাপে নাজেহাল মানুষ, নতুন সরকারের সামনে বড় পরীক্ষা


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:৩৭ এএম

বাজার ও মূল্যস্ফীতির চাপে নাজেহাল মানুষ, নতুন সরকারের সামনে বড় পরীক্ষা
ছবি: এআই

দায়িত্ব গ্রহণের পরই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকারের সামনে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে বাজার পরিস্থিতি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। গত বুধবার মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই নতুন সরকারপ্রধান স্পষ্ট করে জানান, প্রথম তিন মাসের অগ্রাধিকার হবে দ্রব্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতিকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা। নির্বাচন-পরবর্তী অর্থনৈতিক চাপ, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং রমজানকে কেন্দ্র করে বাড়তি চাহিদা-সব মিলিয়ে বাজারে এখনো পুরোপুরি স্বস্তি ফেরেনি।

মন্ত্রিসভার বৈঠকে রমজান মাসে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, মজুতদারি ও কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানানো হয়। বাজার তদারকিতে প্রশাসনকে মাঠপর্যায়ে আরও সক্রিয় থাকতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের একটি বিশেষ কর্মপরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেখানে কোন মন্ত্রণালয় কী দায়িত্ব নেবে-তার সুস্পষ্ট তালিকা দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠাতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে আমদানিনীতিতে পরিবর্তন, সরবরাহ ব্যবস্থায় সমন্বয় জোরদার এবং বাজার নজরদারি বাড়ানোর মতো নীতিগত সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।

এমন প্রেক্ষাপটেই শুরু হয়েছে রমজান। প্রতি বছরের মতো এবারও বেশ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ চরম চাপে পড়েছেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজারে শুধু ভ্রাম্যমাণ আদালত বা অভিযান চালিয়ে সাময়িক স্বস্তি দেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনতে হলে উৎপাদন, আমদানি, পরিবহন ও খুচরা পর্যায়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অপরিহার্য। পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হার, আমদানি ব্যয় ও সরবরাহ শৃঙ্খলার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি।

এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নতুন সরকারের প্রথম তিন মাসের কর্মপরিকল্পনায় বাজার ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া অত্যন্ত যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। গত কয়েক বছরে ধারাবাহিক মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের আর্থিক সুরক্ষা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাজার স্থিতিশীল করা গেলে জনগণের ভোগান্তি কিছুটা হলেও কমবে।

তিনি আরও বলেন, এ লক্ষ্য অর্জনে সরকারকে একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি আমদানি থেকে শুরু করে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়মতান্ত্রিক ও স্বচ্ছভাবে পরিচালনা করা জরুরি। সময়মতো প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি এবং পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সাধারণ মানুষের আয়ের তুলনায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় হয়ে উঠেছে। মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। তবে শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়, সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, আমদানি-রপ্তানি নীতিতে সামঞ্জস্য আনা, বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে সমন্বয় জরুরি। প্রথম তিন মাসই হবে নতুন সরকারের দক্ষতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রকৃত পরীক্ষা।

ব্যবসায়ীদের মতে, চলতি বছর সরবরাহ পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো ছিল। ডলারের দাম স্থিতিশীল থাকায় আমদানিতে সুবিধা হয়েছে এবং এলসি খোলার মার্জিনও কমেছে। এমনকি বিদায়ী বাণিজ্য উপদেষ্টা দাবি করেছিলেন, রমজানের পণ্যে ঘাটতি নেই; বরং আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি আমদানি হয়েছে। তবু বাজারে সেই স্বস্তি পুরোপুরি না থাকায় প্রশ্ন উঠছে-সমস্যা কি সরবরাহে, নাকি বাজার ব্যবস্থাপনায়?

অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। জানুয়ারি মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি ও সবজির দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আগের অন্তর্বর্তী সরকার সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছিল, যা এখনো বহাল আছে। নীতি সুদহার বাড়ানো ও ঋণপ্রবাহ কমানোর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমানোর চেষ্টা হলেও প্রত্যাশিত ফল আসেনি। বরং বিনিয়োগ ও উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। যদিও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল কঠোর মুদ্রানীতির ওপর জোর দিচ্ছে, দেশীয় বাস্তবতায় উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে।

সব মিলিয়ে নতুন সরকারের সামনে এখন সময়ের কঠিন পরীক্ষা। প্রথম তিন মাসে যদি বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফেরানো যায়, তাহলে জনগণের আস্থা বাড়বে। আর দৃশ্যমান অগ্রগতি না এলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কাই থেকে যাচ্ছে। তাই সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।